টানা বৃষ্টি এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলে চট্টগ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের বেশ কয়েকটি উপজেলা ভয়াবহ প্লাবিত হয়েছে। এর ফলে অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দ্রুত ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে জেলা প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জানান, টানা বৃষ্টিপাত এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা আকস্মিক ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তবে সব মিলিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। সাতকানিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার প্রায় প্রতিটি গ্রামই এখন পানির নিচে। বিশেষ করে ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে পৌরসভা ও রামপুর এলাকায় প্রবল বেগে পানি প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে সাতকানিয়ায় অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য উপজেলার ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও মোবাইল নেটওয়ার্কের তীব্র বিভ্রাটের কারণে মাঠ পর্যায়ের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে বেগ পেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। এছাড়া প্রবল ঝড়ে গাছ উপড়ে বিদ্যুৎ লাইনের তার ছিঁড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার খাতিরে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাঙ্গু নদী, ডলু নদী এবং হাঙ্গর খালের মাধ্যমে পাহাড় থেকে আসা ঢল দ্রুত গতিতে নেমে আসায় বন্যা পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে অবনতি হয়েছে। সাঙ্গু নদীর পানির উচ্চতা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাটি এলাকায় পানির স্তর দ্রুত বাড়ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর দোহাজারী অংশে পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম জানান, সাতকানিয়ায় উদ্ধারকাজে গতি আনতে এবং দ্রুত লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে ১০টি স্পিডবোটের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে নৌকার মাধ্যমে সীমিত পরিসরে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাঁশখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকন জানান, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে পুঁইছড়ি, নাপোড়া, ছনুয়া, সরল, শেখের খীল, বৈলছড়ী ও কাথারিয়া ইউনিয়নের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। সব মিলিয়ে এই উপজেলায় অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। চন্দনাইশ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমান জানান, হাশিমপুর ও জোয়ারা ইউনিয়ন বাদে উপজেলার প্রায় সবকটি ইউনিয়নই কমবেশি দুর্গত হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় এই যে, এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

লোহাগাড়ার ইউএনও বায়েজিদ বিন আখন্দ জানান, উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে সাঙ্গু ও ডলু নদী সংলগ্ন আমিরাবাদ, আধুনগর, পদুয়া ও লোহাগাড়া ইউনিয়নে পানি বেশি উঠেছে। এর মধ্যে আমিরাবাদ ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রামে গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে টানা পাঁচ দিন ধরে বৃষ্টিপাত হলেও আজ বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমেছে। তবে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস সন্ধ্যা পর্যন্ত মোট ২২৩ দশমিক ৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম আরও জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। বানভাসি মানুষ যাতে খাদ্যসংকটে না পড়েন, সেই লক্ষ্যে ইউএনওদের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত এই বরাদ্দ বিতরণ করা হচ্ছে।