খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে পাকিস্তান থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চুক্তির মাধ্যমে এই চাল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যদিও সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পাকিস্তান থেকে আসা চালের কিছু চালান খাদ্য নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে ফেরত পাঠিয়েছে। সরকারি খাদ্য মজুত শক্তিশালী করা, বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ রাখা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, জুলাই মাসের শুরুতেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এই আমদানির আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক কঠোর পদক্ষেপের পর বাংলাদেশের এই আমদানি পরিকল্পনা নিয়ে দেশীয় পর্যায়ে নানা বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন পাকিস্তানের চাল আমদানির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেনি। পাকিস্তান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে এবং প্রতি বছর এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বাজারে লাখ লাখ টন চাল রপ্তানি করে থাকে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অত্যন্ত কঠোর খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং আমদানি বিধিনিষেধ পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু চালের চালান তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। লিসবন পোস্টের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পাকিস্তানি চালের চালানগুলো ফেরত পাঠানোর প্রধান কারণ ছিল চালের মধ্যে ইইউ নির্ধারিত সীমার চেয়ে অধিক পরিমাণে কীটনাশকের উপস্থিতি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ভোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং কৃষি রাসায়নিকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠোর কীটনাশক নীতি অনুসরণ করে। সেখানে প্রতিটি আমদানি করা খাদ্যপণ্যের কঠোর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হয় এবং যদি কোনো পণ্যে আইনি সীমার চেয়ে বেশি রাসায়নিক পাওয়া যায়, তবে সেই চালানটি হয় ফেরত পাঠানো হয় অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়।

কীটনাশকের পাশাপাশি আরেকটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে 'আফলাটক্সিন' দূষণ। আফলাটক্সিন হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক বিষ, যা মূলত নির্দিষ্ট কিছু ছত্রাকের মাধ্যমে উৎপাদিত হয়। শস্য মজুতকরণ, পরিবহন কিংবা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় যদি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ না করা হয়, তবে এই ছত্রাক জন্ম নেয় এবং শস্যকে দূষিত করে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, দীর্ঘ সময় ধরে আফলাটক্সিনযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে তা মানুষের লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের আমদানিকৃত চাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং অনুমোদিত মাত্রার সামান্যতম превышение হলেও তা গ্রহণ করে না।

কেবল স্বাস্থ্যগত কারণই নয়, প্রশাসনিক এবং দাপ্তরিক ত্রুটির কারণেও ইইউ পাকিস্তানের কিছু চালের চালান প্রত্যাখ্যান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নথিপত্রের অসামঞ্জস্যতা, উৎপাদন উৎস শনাক্তকরণে ব্যর্থতা (ট্রেসেবিলিটি ফেইলিউর), অনুপযুক্ত লেবেলিং এবং সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী, রপ্তানিকারক দেশ ও প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই প্রতিটি পণ্যের উৎপত্তিস্থল স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়, বিস্তারিত উৎপাদন রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হয় এবং আন্তর্জাতিক মানের খাদ্য নিরাপত্তা সনদ প্রদান করতে হয়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় বড় কোনো দূষণ না পাওয়া গেলেও, এই ধরনের প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হলে আমদানিকৃত পণ্যের চালান আটকে দেওয়া হয়।

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে জিটুজি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে ৫০ হাজার টন চাল আমদানির সিদ্ধান্তটি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের যুক্তি হলো, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই আমদানি অপরিহার্য। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস পেলে বা কোনো সংকটের মুহূর্তে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই মজুত চাল অত্যন্ত কার্যকর হবে। এছাড়া অন্যান্য চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায় পাকিস্তানের চালের দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন।

তবে খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের প্রধান খাদ্য আমদানির ক্ষেত্রে কেবল দামকে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হিসেবে ধরা উচিত হবে না। তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রবেশ করা প্রতিটি চালের চালান স্থানীয় বাজারে ছাড়ার আগে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কীটনাশকের উপস্থিতি, আফলাটক্সিনের মাত্রা, ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক দূষক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে উন্নত ল্যাবরেটরিতে ব্যাপক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাওয়া উচিত। বিশেষ করে যখন কোনো খাদ্যদ্রব্য এমন কোনো উৎস থেকে আসে যা আন্তর্জাতিকভাবে নিরীক্ষার মুখে পড়েছে, তখন স্বাধীনভাবে গুণমান যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে।

পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পদক্ষেপকে ঢালাওভাবে ভুল বোঝা ঠিক হবে না। নির্দিষ্ট কিছু চালের চালান প্রত্যাখ্যান করার অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানের সব চালই অনিরাপদ। খাদ্য নিরাপত্তা পরিদর্শন প্রতিটি চালানের ভিত্তিতে আলাদাভাবে করা হয়। চাষাবাদের পদ্ধতি, ব্যবহৃত কীটনাশকের ধরন, মজুত করার পরিবেশ এবং গুণমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি চালানের মান ভিন্ন হতে পারে। সুতরাং, যে চাল বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বিধিমালা পূরণ করবে এবং স্বাধীন ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, তা আইনি ও স্বাস্থ্যগতভাবে নিরাপদ হিসেবে গণ্য হবে।

পরিশেষে, পাকিস্তান থেকে চাল আমদানির এই পরিকল্পিত জিটুজি চুক্তিটি বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ওপর এক বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছে। দেশের সাধারণ ভোক্তারা আশা করছেন যে, খাদ্য সংগ্রহ ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থাগুলো অত্যন্ত কঠোর পরিদর্শন পদ্ধতি প্রয়োগ করবে। উপযুক্ত ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরির পরীক্ষার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করা এবং সম্পূর্ণ আমদানি প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ রাখা প্রয়োজন। এই ধরনের স্বচ্ছতা ও কঠোরতা কেবল জনস্বাস্থ্যকেই সুরক্ষা দেবে না, বরং সরকারের ক্রয় সিদ্ধান্ত এবং খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় করবে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে যখন এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে, তখন মূল প্রশ্নটি চালের উৎস নিয়ে নয়, বরং প্রতিটি চালানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড শতভাগ মানা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। যদি ব্যাপক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আমদানি করা চাল কীটনাশক ও আফলাটক্সিন মুক্ত এবং নির্ধারিত সীমার মধ্যে রয়েছে, তবেই ভোক্তারা এর নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারবেন। অন্যথায়, অর্থনৈতিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাবে।