গত বছর ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অংশগ্রহণ না করার নেপথ্যে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তই প্রধান কারণ ছিল বলে জানিয়েছে গঠিত তদন্ত কমিটি। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর স্পষ্টভাবে জানান, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের আসরে বাংলাদেশ দলের অনুপস্থিতির জন্য তৎকালীন সরকার এবং বিশেষ করে আসিফ নজরুল সরাসরি দায়ী। তিনি বলেন, "তদন্তে যা উঠে এসেছে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে আমরা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, তা হলো—বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার পেছনে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্ত ও তৎকালীন সরকারের ভূমিকা দায়ী ছিল।" তিনি আরও আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি ক্রিকেট পাগল দেশের দলের অবশ্যই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করা উচিত ছিল।

গত মার্চ মাসে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এই ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) ড. এ কে এম ওলি উল্যার নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে আরও সদস্য হিসেবে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর এবং সাবেক জাতীয় অধিনায়ক ও বর্তমান প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। তদন্ত কমিটি তাদের ২২ পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদনে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য কমিটি মোট ১২ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। যাদের মধ্যে ছিলেন জাতীয় দলের বর্তমান অধিনায়ক লিটন কুমার দাস এবং টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ক্রিকেট অঙ্গনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্বদের মধ্যে সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবি-র প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, জাতীয় দলের কোচ ও তৎকালীন সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং তৎকালীন বিসিবি পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীনের মতামত নেওয়া হয়। এছাড়া যুব ও ক্রীড়া সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা করেছে কমিটি।

ক্রীড়া সাংবাদিকতার দিক থেকেও বিষয়টি যাচাই করতে বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রেদুয়ানুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত আহমেদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। তবে প্রতিবেদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে—তদন্ত কমিটি সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা কোনো সাড়া দেননি।

তদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনার সূত্রপাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মোস্তাফিজুর রহমানের আইপিএল অভিজ্ঞতা। আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সে সুযোগ পাওয়ার পর ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড (বিসিসিআই) মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত নিরাপত্তাজনিত কারণে তাকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনার পর নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাংলাদেশ দল ভারতে না গিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত কোনো বিকল্প ব্যবস্থায় অংশ নেবে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এই অনুরোধে সম্মতি দেয়নি। শেষ পর্যন্ত আইসিসির অনীহা এবং অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ নিতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের পরিবর্তে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ দেওয়া হয়।