স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) এবং সরকারের মধ্যে এক ধরনের মতপার্থক্য বা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বসতে যাচ্ছে কমিশন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এই বৈঠকটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ এই বৈঠকের পর প্রাপ্ত সিদ্ধান্তের আলোকেই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে ইসি।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এক বিবৃতিতে জানান, আগামী ১৭ সেপ্টেম্বরের এই বৈঠকে নির্বাচনের মূল রূপরেখা ও তারিখ নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ওই বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ঠিক কবে থেকে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সচিব আখতার আহমেদ সরাসরি কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাতে রাজি হননি। তিনি বিনয়ের সাথে বলেন, প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের বিষয়ে জবাব দেওয়ার অবস্থানে কমিশন নেই। তবে তারিখ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

এর আগে সোমবার কমিশন সভা শেষে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ দেশের ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদে সাত ধাপে নির্বাচন আয়োজনের একটি প্রাথমিক খসড়া পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন। কমিশনের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণের কথা বলা হয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় ধাপের ভোট ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপের ভোট ৩০ ডিসেম্বরে আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, চতুর্থ ধাপের নির্বাচন আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম তথা শেষ ধাপের ভোট ২৭ মে অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রথম ধাপে দেশের প্রায় ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিলেন কমিশনার। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এগুলো কেবল প্রাথমিক সিদ্ধান্ত এবং চূড়ান্ত সময়সূচি সম্পূর্ণভাবে ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য তারিখগুলো সামনে আসার পর সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি জানান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি সম্পর্কে তারা জানতে পেরেছেন। তবে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশনের কোনো পূর্ব আলোচনা বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচন আয়োজনের পূর্ণ ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তবে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা, বাজেট বরাদ্দ এবং মাঠ পর্যায়ের প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে সরকারের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা করে তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, কমিশন যে সম্ভাব্য তারিখগুলো ঘোষণা করেছে, সে বিষয়ে সরকার আগে থেকে অবহিত ছিল না এবং মন্ত্রণালয়ের সাথে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি।

নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের এই ভিন্ন অবস্থানের ফলে এখন সবার নজর ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের দিকে। এই বৈঠকে সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বিষয়গুলো পর্যালোচনার পর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চূড়ান্ত সময়সূচি পরিষ্কার হতে পারে। ফলে ইসির ঘোষিত প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী ১২ নভেম্বর প্রথম ধাপের ভোট হবে কি না, সেটি নিশ্চিত হতে এখন আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে।