জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আদর্শের মাঝে যে মৌলিক ও গভীর বৈপরীত্য বিদ্যমান, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। মওদুদী নাকি জিন্নাহ—জামায়াতের প্রকৃত ‘রাজনৈতিক পিতা’ হিসেবে আসলে কাকে গণ্য করা হবে এবং কার আদর্শ অনুসরণ করা হবে, সে বিষয়ে দলটির অবস্থান অবিলম্বে স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিস্তারিত ও বিশ্লেষণধর্মী পোস্টে এই প্রশ্ন উত্থাপন করেন রাশেদ খান। তিনি তার পোস্টে স্পষ্টভাবে লিখেছেন, ‘জামায়াত-শিবিরকে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে যেকোনো একজনকে তাদের রাজনৈতিক পিতা হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত। জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদী এই সংগঠনের রাজনৈতিক পিতা, অন্যদিকে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হলেন পাকিস্তানের জাতির পিতা। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে, এই দুই ব্যক্তিত্বের চিন্তা-চেতনা ও রাজনৈতিক আদর্শ ছিল সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী।’
রাশেদ খান তার যুক্তিতে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর আদর্শ অনুসরণ করলে মওদুদীর আদর্শকে মেনে চলা প্রায় অসম্ভব। কারণ, জিন্নাহ ছিলেন একজন মধ্যপন্থী রাজনৈতিক নেতা এবং তিনি মূলত পশ্চিমা ভাবধারার জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। বিপরীতে, আবুল আলা মওদুদী বিশ্বাস করতেন বিশুদ্ধ ইসলামি ভাবধারায়, যেখানে ভৌগোলিক সীমানার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদের কোনো স্থান নেই। অর্থাৎ, দ্বিজাতিতত্ত্বের যে রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল, মওদুদীর চিন্তা ছিল তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
পোস্টে তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, বর্তমান জামায়াত কেন এই পরস্পরবিরোধী দুজন ব্যক্তিত্বকেই তাদের রাজনৈতিক পিতা বা আদর্শ হিসেবে মানতে চায়? যারা প্রকৃতপক্ষে মওদুদীবাদী, তারা যদি জিন্নাহবাদী হওয়ার চেষ্টা করে, তবে তা কি মওদুদীর মূল আদর্শ থেকে চরম বিচ্যুতি নয়? রাশেদ খানের মতে, বর্তমান জামায়াত কি তাদের মূলধারা থেকে আদর্শচ্যুত হয়ে পড়েছে? তিনি প্রশ্ন করেন, ইসলামি বা শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরে গিয়ে তারা কি এখন পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকেই তাদের আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে?
এই বিষয়ে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি। রাশেদ খান সতর্ক করে লিখেছেন, ‘অন্যথায় জামায়াতের বর্তমান নেতাকর্মীরা আধা ইসলামি এবং আধা মধ্যপন্থী আদর্শের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ অনুসরণ করতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন, যা তাদের বেপরোয়া ও হঠকারী করে তুলছে। এই সমস্যাটি মূলত তৃণমূল নেতাকর্মীদের নয়, বরং দলটির নীতিনির্ধারকদের চরম ব্যর্থতা।’
তার দাবি, ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা তাদের নেতাকর্মীদের সঠিক আদর্শিক দীক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন, আর এই কারণেই বর্তমান জামায়াতের এমন চরম অধঃপতন ঘটেছে। এছাড়া তার পোস্টে জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের সন্তান ব্রিগেডিয়ার আমান আযমীর একটি মন্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে আমান আযমী লিখেছেন, ‘আমার বাবা যে জামায়াত করেছিলেন, আর বর্তমানের এই জামায়াত এক নয়!’
















