সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যে অনুসন্ধান শুরু করেছে, তার প্রাথমিক ভিত্তি এবং তথ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাই নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথাকথিত ‘এআই-নির্মিত’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি করা অভিযোগের সঙ্গে দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানের তথ্যের অদ্ভুত মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুদকের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের করা এসব প্রশ্নের মুখে সংস্থাটির সচিব সাইদুর রহমান খান তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন।
ব্রিফিং চলাকালীন সাংবাদিকদের প্রধান প্রশ্ন ছিল—আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানে যাওয়ার আগে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা বা ভিত্তি যাচাই করা হয়েছিল কি না। এ বিষয়ে দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানান, অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই কমিশন পরবর্তী ধাপে এগিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলমান এই প্রক্রিয়ায় আরও যেসব নতুন তথ্য বেরিয়ে আসবে, সেগুলোর সামগ্রিক পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানের তথ্যের উৎস নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন সাংবাদিকরা উল্লেখ করেন যে, কয়েক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কিছু ‘এআই-নির্ভর’ তথ্য ছড়িয়েছিল। দুদকের বর্তমান অভিযোগগুলোর সঙ্গে সেই তথ্যের অনেক মিল রয়েছে। এই বিষয়ে সচিব সাইদুর রহমান খান সরাসরি কোনো স্বীকৃতি না দিয়ে বলেন, "না, অনেক কথাই বলা হচ্ছে।" তবে তিনি পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, অভিযোগগুলো মনগড়া কি না কিংবা দুদক কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করছে কি না, তা সবাই নিজেরাই বুঝতে পারবেন।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গঠন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে পারস্পরিক আইনি সহায়তা বা ‘এমএলএআর’ (MLAT) প্রক্রিয়া শুরু করা হবে কি না, জানতে চাওয়া হলে সচিব জানান, আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিদেশি কর্তৃপক্ষের সহায়তা প্রয়োজন হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় এমএলএআর পাঠানো হবে। তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে তাতে সারবত্তা পাওয়া গেলে তবেই পরবর্তী আইনি ধাপে এগোবে দুদক। উল্লেখ্য, এমএলএআরের মাধ্যমে অন্য দেশের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের মতো সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া নিয়োগ ও পদায়নের বিনিময়ে অর্থ লেনদেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে যে, এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
এদিকে, এই অনুসন্ধানের তথ্যের সঙ্গে প্রায় সাত মাস আগে ইন্টারনেটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মিল পাওয়া গেছে। ওই পুরনো প্রতিবেদনটিতে অভিযোগগুলোর সপক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা নির্দিষ্ট সূত্রের উল্লেখ ছিল না, যা নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক ছিল। ফলে দুদকের বর্তমান অনুসন্ধানে সেই তথ্যের প্রভাব কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে দুদক বরাবরই বলছে, তারা প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রমে গেছে।
অন্যদিকে, দুদকের এসব অভিযোগ ও অনুসন্ধানকে পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ। সোমবার এক আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘প্রতিশোধের প্রক্রিয়া’ এবং পরিকল্পিত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, তাকে রাজনৈতিকভাবে হেনস্তা করার লক্ষ্যেই এই ধরণের ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে।















