ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. শামীম হুসাইন সম্প্রতি প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনের বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, ভুল, অসত্য ও সম্পূর্ণ মনগড়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার এবং তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্মানহানি করার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্রসমূহ পর্যালোচনা করে তিনি এই দাবি উত্থাপন করেন।

বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে ‘শামীম-কেশবদের ঘুষের হাট’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ছয়টি পৃথক অভিযোগ আনা হলেও, সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথিপত্র যাচাই করলে দেখা যায়, এসব অভিযোগের সাথে তার কোনো প্রকার সংশ্লিষ্টতা বা দায়বদ্ধতা নেই। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রেই তথ্য বিকৃত করে তাকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রথম অভিযোগটি ছিল জোয়ার সাহারা মৌজার ০৮/২৩-২৪ নং ভূমি অধিগ্রহণের মামলায় অনিয়মের বিষয়ে। শামীম হুসাইন জানান, নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ২৫ মে ২০২৫ তারিখে ঢাকার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. বদরুদ্দোজা শুভ জমির মালিক মো. আব্দুল মান্নানকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করেন। উক্ত পেমেন্টটি চেক নং- ১০৯১৪১৮ এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছিল। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, যে সময়ে এই কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে, সেই সময়ে তিনি ওই দপ্তরে বা ওই দায়িত্বে ছিলেন না। ফলে কোনো দায়িত্বই পালন না করে তার নামে এমন অবান্তর অভিযোগ আনা প্রমাণ করে যে, একটি নির্দিষ্ট চক্র তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়।

দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল আবদুল্লাহপুর মৌজার ভূমি অধিগ্রহণ ১৮/২৩-২৪ নং মামলার বিষয়ে। শামীম হুসাইন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে এই মামলায় অনিয়ম হয়েছে, অথচ গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এই এল.এ কেসের ক্ষতিপূরণ চেকের অ্যাডভাইস প্রদান করেছিলেন ঢাকার তৎকালীন একজন কর্মকর্তা। নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সকল সরকারি নিয়ম ও বিধিমালা যথাযথভাবে মেনে এই ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছেন। যেখানে তিনি দায়িত্বশীল পদে ছিলেন না, সেখানে তাকে অভিযুক্ত করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

তৃতীয় অভিযোগে নড়াইবাগ মৌজার ০৪/২২-২৩ নং ভূমি অধিগ্রহণ মামলায় মূল মালিক বাদ দিয়ে তার ভাই জসিমকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে শামীম হুসাইন জানান, সেই সময়েও তিনি এল.এ শাখার দায়িত্বে ছিলেন না। নথিপত্র ও তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, ক্ষতিপূরণ গ্রহণকারী জসিমউদ্দিন আহমেদের অন্যান্য ভাই ও বোনেরা একটি ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে লিখিতভাবে অনুরোধ জানিয়েছিলেন যেন তাদের ভাই জসিমউদ্দিন আহমেদের অনুকূলে চেকটি হস্তান্তর করা হয়। এ ধরনের একটি সুনির্দিষ্ট দালিলিক বিষয় যেখানে তার ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা নেই, সেখানে তাকে জড়িয়ে সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।

সংবাদের চার নম্বর অভিযোগে রানাভোলা মৌজার ১৩/১৮-১৯ নং ভূমি অধিগ্রহণের একটি মামলায় অনিয়মের কথা বলা হয়েছে। শামীম হুসাইন বিষয়টি পরিষ্কার করে বলেন, গত ২৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শীর্ষক প্রকল্পের ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছিলেন তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মোছা. ফুয়ারা খাতুন। এ বিষয়েও তার কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকা সত্ত্বেও তথ্য যাচাই না করেই তাকে এই বিতর্কে জড়ানো হয়েছে।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে ঘোপ দক্ষিণ এবং কামার ঘোপ মৌজার দুটি ভূমি অধিগ্রহণ মামলায় জমি ও অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের ক্ষেত্রে পাট মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। শামীম হুসাইন বলেন, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। নথিপত্র যাচাই করে দেখা গেছে, এ ঘটনায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এবং ২৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে দুটি পৃথক চিঠির মাধ্যমে যথাযথভাবে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়েই ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। এখানেও তাকে হেয় করার জন্য অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

তার যোগদানের সময়কাল এবং অভিযোগের সময়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধানের বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। শামীম হুসাইন জানান, তিনি ২০২৬ সালের ১৭ জুন এল.এ শাখায় যোগদান করেন। কিন্তু প্রতিবেদনে যে ছয়টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তার সবগুলোই তার যোগদানের আগের সময়ের। অথচ কোনো রকম যাচাই ছাড়াই তাকে এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিবেদনে দুদকের মামলার প্রসঙ্গ টেনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন, তার বিরুদ্ধে কখনোই দুদকের কোনো মামলা হয়নি। এমনকি ২০২০ সালের ১০ মার্চ স্পেশাল মামলা নং- ০০৬/২০২০-এ তাকে ২৪ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, বাস্তবে নথিপত্রে এই মামলায় মোট আসামি মাত্র ৩ জন। এতে তার নাম বা সংশ্লিষ্টতার কোনো ভিত্তি নেই এবং দুদক এই বিষয়ে কোনো তদন্তও গ্রহণ করেনি।

কক্সবাজারে বাঁকখালী নদীর উত্তরপাড় থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দক্ষিণপাড়ে বেশি মূল্যের জমিতে প্রকল্পের জমি নির্ধারণের অভিযোগটিও তিনি ভিত্তিহীন বলে বর্ণনা করেন। নথিপত্র অনুযায়ী, তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মালেকের নির্দেশেই এই স্থান পরিবর্তন করা হয়েছিল এবং প্রকল্প পরিচালক ফিজিবিলিটি স্টাডির ভিত্তিতেই এই সুপারিশ করেছিলেন। এছাড়া ৫২/১৯৮৬ রিসিভারকৃত জমি ব্যক্তির নামে দেখানোর অভিযোগটিও ভুল। এটি আসলে আদালতের একটি ডিক্রি ছিল, কোনো রিসিভার মামলা ছিল না।

সবশেষে, গণমাধ্যমের কাছে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শামীম হুসাইন বলেন, সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই-বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। সামান্য ভুল বা মনগড়া তথ্য মানুষের মনে ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, যা সামাজিক ও পেশাগত জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। তাই গণমাধ্যমগুলোর উচিত প্রতিটি তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর তা প্রকাশ করা।