মাফিকুল ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে সংবাদপত্রের জগতে এসে সত্য, মানুষের অধিকার ও শ্রমজীবী মানুষের কথা তুলে ধরেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক সংসদ সদস্য ও সাংবাদিক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘রণাঙ্গন’, ‘মহাকাল’ ও ‘দৈনিক দাবানল’ উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

আজ ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭৭ বছর বয়সে মারা যান তিনি। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে রংপুরের মুন্সীপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে দাফন করা হয়।

১৯৪৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ইউনিয়নের বুজরুক ঝালাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। তাঁর বাবা ছিলেন এলএমএফ চিকিৎসক ডা. মোজাম্মেল হক খন্দকার এবং মা মাজেদা বেগম।

শিক্ষাজীবনের শুরু কোনাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে কৈলাশরঞ্জন উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিক পাস করে কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন ও সমাজ পরিবর্তনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৬৪ সালে রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ছয় মাস কারাভোগ করেন। পরে রংপুর কলেজে পড়াশোনার সময় ১৯৬৫-৬৬ সালে জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। শ্রমিকদের সংগঠিত করে প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর-দিনাজপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ১৯৭০ সালেও তাঁকে কারাভোগ করতে হয়।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালের ১২ মার্চ রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে শ্রমিক জনসভায় পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। ২৩ মার্চ শ্রমিকদের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চল থেকে পাকিস্তানি শাসকদের জন্য খাদ্যশস্য পরিবহন বন্ধের উদ্যোগ নেন।

নিরাপত্তার কারণে পরে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে কাজ করেন। ভারতের মুক্তাঞ্চল থেকে ‘মুস্তফা করিম’ ছদ্মনামে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক ‘রণাঙ্গন’। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের মনোবল বাড়াতে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুদ্ধকালেই অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন তিনি।

‘রণাঙ্গন’-এর প্রকাশনা ও বিতরণের সঙ্গে যুক্ত খন্দকার বদিউজ্জামান ও নুরুল ইসলাম ঢালী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে শহীদ হন।

স্বাধীনতার পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখেন বাটুল। ‘রণাঙ্গন’ বন্ধ হয়ে গেলে প্রতিষ্ঠা করেন সাপ্তাহিক ‘মহাকাল’। পরে ১৯৮১ সালের ২৭ মে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দৈনিক দাবানল’।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রে কাজ করে অসংখ্য সাংবাদিক পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হন। এ কারণে বাটুলকে উত্তরাঞ্চলে সাংবাদিক তৈরির অন্যতম কারিগর হিসেবেও স্মরণ করা হয়।

রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে মিঠাপুকুর আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মিঠাপুকুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রংপুর খেলাঘর, শিখা সংসদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশেও তাঁর অবদান রয়েছে।

পারিবারিক জীবনে স্ত্রী ও দুই ছেলে রেখে গেছেন তিনি। বড় ছেলে খন্দকার মোস্তফা মোর্শেদ ব্যবসার পাশাপাশি ‘দৈনিক দাবানল’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং ছোট ছেলে খন্দকার মোস্তফা সরওয়ার অনু পত্রিকাটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মৃত্যুর ছয় বছর পরও খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলের কর্ম ও আদর্শ রংপুরের সাংবাদিকতা ও সামাজিক অঙ্গনে স্মরণীয় হয়ে আছে। সত্যের পক্ষে আপসহীন অবস্থান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং প্রান্তিক মানুষের কথা বলার সাহসই ছিল তাঁর সাংবাদিকতার মূল শক্তি।

‘রণাঙ্গন’ থেকে ‘মহাকাল’, আর ‘মহাকাল’ পেরিয়ে ‘দৈনিক দাবানল’—এই দীর্ঘ পথচলায় খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল রেখে গেছেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সাংবাদিক প্রজন্ম এবং সাহসী সাংবাদিকতার এক অনন্য উত্তরাধিকার।