বাংলাদেশের লোকসংগীতের এক অনন্য কণ্ঠস্বর আনুশেহ আনাদিল। তাঁর গায়কিতে লালন, বাউল ও মরমি গানের যে মায়াবী সুর শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে, তা দীর্ঘকাল ধরে দেশজুড়ে সমাদৃত। তবে সম্প্রতি সেই প্রিয় শিল্পী তাঁর জীবনের এক অত্যন্ত কঠিন ও বেদনাদায়ক বাস্তবতার কথা সামনে এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাঁর শ্রবণশক্তি, আর এই শারীরিক সীমাবদ্ধতাই তাঁকে গান থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক আবেগঘন বার্তায় আনুশেহ জানান, তিনি 'টিনিটাস' (Tinnitus) নামক এক জটিল সমস্যায় আক্রান্ত। এই রোগের ফলে তাঁর কানের ভেতরে সারাক্ষণ এক ধরনের তীব্র ও অস্বস্তিকর শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে, যা সরাসরি তাঁর শ্রবণক্ষমতাকে প্রভাবিত করছে। এমনকি সাধারণ উচ্চ শব্দ এখন তাঁর জন্য অসহনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের নীরবতার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছেন, “আমি শুধু সত্যিটা বলতে চেয়েছিলাম যে কেন আমি আর গান করি না। আমি ধীরে ধীরে আমার শোনার ক্ষমতা হারাচ্ছি। আমার টিনিটাস হয়েছে এবং কানের ভেতরের শব্দ এখন এত তীব্র যে আমি আর উচ্চ শব্দ সহ্য করতে পারি না। এটি আক্ষরিক অর্থেই আমার কানে তীব্র ব্যথা তৈরি করে।”

চিকিৎসার কথা উল্লেখ করে আনুশেহ জানান, চিকিৎসকেরা তাঁকে হিয়ারিং এইড বা শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ব্যবহার করার পর তিনি লক্ষ্য করেন, পরিস্থিতির উন্নতির বদলে অবনতি হচ্ছে। যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা যেন তাঁর শোনার ক্ষমতাকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে এবং টিনিটাসের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে শেষ পর্যন্ত তিনি হিয়ারিং এইড ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লিখেছেন, “ডাক্তাররা আমাকে হিয়ারিং এইড পরতে বলেছিলেন। কিন্তু সেটার ওপর নির্ভরশীলতা আমাকে আরও কম শুনতে সাহায্য করছে এবং আমার টিনিটাস আরও খারাপ করছে। তাই আমি সেটি ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছি।”

এই অসুস্থতা কেবল তাঁর গানকেই কেড়ে নেয়নি, বরং বদলে দিয়েছে তাঁর জীবনযাপনের ধরন। শহরের যান্ত্রিকতা আর কোলাহল এখন তাঁর কাছে দুঃসহ। তাই তিনি বেছে নিয়েছেন এক প্রশান্ত পরিবেশ। বর্তমানে তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'সরলবাড়ি ইকো রিসোর্ট'-এ বসবাস করছেন। এই রিসোর্টটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, বরং বাউল শিল্পীদের জন্য এক ধরনের আশ্রয়স্থল বা আশ্রম হিসেবে পরিচিত। শান্ত পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এই কারণেই আমি গ্রামে থাকতে পছন্দ করি। সেখানে পরিবেশ শান্ত এবং আমার কানের জন্য সেটি সহজ ও আরামদায়ক।”

বাংলাদেশের লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে আনুশেহ আনাদিলের অবদান অনস্বীকার্য। ‘ব্যান্ড বাংলা’র মাধ্যমে তিনি বাউল, লালন ও মরমি গানকে এক আধুনিক ও নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করে সংগীত জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠশৈলী ও গায়কির জন্য তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শ্রোতাদের অকুন্ঠ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা পেয়েছেন। তাঁর জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে ‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা’, ‘ঘাটে লাগাইয়া ডিঙ্গা’, ‘সহজ মানুষ’, ‘কৃষ্ণপক্ষ’ এবং ‘আমি ওপার হয়ে’-র মতো কালজয়ী সৃষ্টি। এক সময়ের সুরের জাদুকর আজ নীরবতার সঙ্গে লড়াই করছেন, তবে তাঁর গানগুলো চিরকাল শ্রোতাদের হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে।