দিল্লির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কিলোকরি এলাকায় এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন মণিপুরের প্রখ্যাত গিটারবাদক ও সংগীতশিল্পী চোংথম বিক্রম সিংহ। রবিবার গভীর রাতে বাড়ির সামনে মদ্যপ অবস্থায় চিৎকার ও হইচই করার প্রতিবাদ করায় একদল যুবকের কাছে হামলার শিকার হন ৫৪ বছর বয়সী এই শিল্পী। গুরুতর আহত অবস্থায় সোমবার সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি ঘটে রবিবার রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ। জানা গেছে, বিক্রম তাঁর স্ত্রী জোশনা ও ২০ বছর বয়সী ছেলে ইয়াইফাবাকে নিয়ে ওই এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। আবর্জনা ফেলতে নিচে নামার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, বাড়ির সামনের একটি ধাবার কর্মী ও ডেলিভারি পার্সেল সরবরাহকারীরা অত্যন্ত উচ্চস্বরে চিৎকার ও হইচই করছেন। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে মদ্যপানের ঘটনাও চলছিল। বিক্রম তাঁদের শব্দ কমাতে অনুরোধ করলে তাঁদের সঙ্গে তাঁর বচসা বাধে। মণিপুরি সমাজকর্মী বি রুচিদা শর্মার বয়ান অনুযায়ী, বচসার পর বিক্রম যখন পুনরায় বাড়ির দিকে ফিরছিলেন, তখনই অভিযুক্ত যুবকরা তাঁকে তাড়া করে বাড়ির তিনতলায় নিয়ে যায় এবং করিডোরে বেধড়ক মারধর করে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, হামলার পর কয়েকজন অভিযুক্ত সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে।

রাত ১টা ৩৮ মিনিটে সানলাইট কলোনি থানায় হামলার বিষয়টি জানানো হয়। বিক্রমের ছেলে তাঁকে দ্রুত ওখলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সোমবার সকাল ৭টা নাগাদ চিকিৎসকরা তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মতে, মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাতের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

এই ঘটনায় পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে ভারত কুমার, প্রমোদ, রমজান খান, বিজয়, দীপাংশু, মোহন বিশ্বকর্মা ও মান্নুকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া একজন ১৫ বছর বয়সী নাবালকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন ওই ধাবাতেই কাজ করতেন। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(২) ও ৩(৫) ধারায় খুনের মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মণিপুরের রক সঙ্গীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন বিক্রম সিংহ। আশির দশকে ‘ফিনিক্স’, ‘আল্ট্রা ভাইরেস’ এবং ‘ইস্টার্ন ডার্ক’-এর মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। গত ১৭ বছর ধরে তিনি দিল্লিতে সংগীত শিক্ষা দিয়ে আসছিলেন। তাঁর এই অকাল প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী খেমচাঁদ ইয়ুমনাম। তিনি বলেন, রাজ্যের সাংস্কৃতিক জীবনে বিক্রমের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংহও দিল্লি পুলিশের কাছে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, এই ঘটনাটি জাতীয় রাজনীতিতেও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী রাজধানী দিল্লিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, "নিজের বাড়ির সামনেই একজন বাবাকে প্রাণ দিতে হলো। এই ঘটনাটি উত্তর-পূর্বের প্রতিটি পরিবারের মনে একই প্রশ্ন ও ভয়ের সঞ্চার করেছে।" সোমবার সন্ধ্যায় প্রায় ১০০ জন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাসিন্দা মোমবাতি মিছিলের মাধ্যমে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান। পুলিশ জানিয়েছে, এই হামলার পেছনে কোনো জাতিগত বিদ্বেষ কাজ করেছে কি না, তা গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।