মানুষ পৃথিবীতে নানা আকাঙ্ক্ষা, প্রলোভন আর মোহে জীবন অতিবাহিত করে। কারো লক্ষ্য থাকে অঢেল অর্থবিত্তের মোহ, কেউবা ছুটে বেড়ায় খ্যাতি ও যশের পেছনে। আবার কেউ কেউ ক্ষমতার দাপট আর প্রভাব বিস্তারের নেশায় মত্ত থাকে। কেবল জাগতিক স্বার্থই নয়, অনেক সময় নারীসঙ্গের মোহ কিংবা যৌন আকাঙ্ক্ষাও মানুষকে বিভিন্ন কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ করে। অনেকে আবার প্রভুত্বপ্রিয়তা কিংবা লোকরঞ্জনের লোভে পড়ে এমন সব কাজ করে বসে, যার মূল লক্ষ্য থাকে অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। মানুষের এই অন্তহীন জাগতিক উদ্দেশ্য আর নিয়তের গোলকধাঁধায় জীবন আবর্তিত হয়।
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টির বাইরে অন্য যেকোনো উদ্দেশ্যকে 'গায়রুল্লাহ' বলা হয়। আর যখন কোনো নেক কাজ কেবল লোক দেখানোর জন্য বা প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন তাকে অভিহিত করা হয় 'রিয়া' হিসেবে। মনে রাখতে হবে, রিয়াদুষ্ট কোনো আমল, তা বাহ্যিকভাবে যত মহৎ বা বিশালই হোক না কেন, মহান আল্লাহর কাছে তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হয় না। কবুলিয়তের সেই বিশেষ রহমত থেকে তা বঞ্চিত থাকে। এই বিষয়ে নবী কারিম (সা.) স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, কোনো মহৎ কাজে যদি বিন্দুমাত্র রিয়া বা লোকরঞ্জনের অভিলাষ মিশে থাকে, তবে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না (ইমাম নাসায়ি, আস-সুনান, হাদিস: ৩১৪০)।
রিয়ার ভয়াবহতা বোঝাতে নবীজি (সা.) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিনজন ব্যক্তিকে আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে। তাদের একজন হবেন একজন প্রথিতযশা আলেম, একজন হবেন অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি এবং তৃতীয়জন হবেন একজন শহীদ। প্রথমে আলেমজনকে জিজ্ঞাসা করা হবে, 'তুমি দুনিয়াতে এসে কী করেছ?' তিনি উত্তর দেবেন, 'আমি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করেছি এবং এর প্রচার-প্রসারে আমার জীবন ব্যয় করেছি।' তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, 'তুমি এই সবকিছু করেছ কেবল খ্যাতি অর্জনের জন্য, আমার সন্তুষ্টির জন্য নয়।' এরপর নির্দেশ দেওয়া হবে, তাকে অধোমুখ করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে। ঠিক একইভাবে, দানশীল হিসেবে খ্যাত ব্যক্তি এবং শহীদ হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিকেও জিজ্ঞাসাবাদের পর দেখা যাবে তাদের নিয়ত বিশুদ্ধ ছিল না। লোকচক্ষুর প্রশংসা পাওয়ার এই বৈকল্যের কারণে তাদেরও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে (ইমাম মুসলিম, আস-সহিহ, হাদিস: ১৯০৫)।
এর বিপরীতে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা সামান্য কাজও নাজাতের জন্য যথেষ্ট হতে পারে। নবীজি (সা.) উপদেশ দিয়ে বলেছেন, 'তোমরা দ্বীনকে খালিস ও নির্ভেজাল করো; অল্প আমলই তোমার জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে।' পবিত্র কোরআনে সৎকর্মশীলদের প্রশংসায় আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, 'তারা আল্লাহর জন্যই তাদের দ্বীন ও আমলকে নির্ভেজাল ও নিরেট করে' (সুরা বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫)। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহর কাছে একমাত্র বিশুদ্ধ ও খালিস আমলই গ্রহণযোগ্য। কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, 'শোনো, আল্লাহর জন্য হলো বিশুদ্ধ ও খালিস দ্বীন' (সুরা জুমার, আয়াত: ৩)।
আমলের গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। নবীজি (সা.) সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, 'আমল তো নিয়ত অনুসারেই বিবেচ্য হয়। যে ব্যক্তি যে ধরনের নিয়ত করবে, তার জন্য সে ধরনের প্রতিদান হবে।' উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, 'যার হিজরত হবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য, তবে তার হিজরত বিবেচিত হবে আল্লাহর ও তাঁর রাসুলের জন্যই। আর যার হিজরত হবে দুনিয়াবী কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য কিংবা কোনো নারীকে বিয়ের উদ্দেশ্যে, তবে তার হিজরত সেই উদ্দেশ্যেই গণ্য হবে' (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস: ১)।
একজন প্রকৃত মুমিনের লক্ষ্য হতে হবে পুরস্কারের ঊর্ধ্বে। কাজের বিনিময়ে কী পাওয়া গেল, তার চেয়ে বড় কথা হলো কাজটি কার জন্য করা হলো। অনেক আল্লাহঘনিষ্ঠ বান্দা মনে করেন, তাদের প্রতিটি কাজের একমাত্র মাকসুদ বা লক্ষ্য হবে আল্লাহ। এমনকি জাহান্নাম থেকে মুক্তি কিংবা জান্নাত লাভ করার বিষয়টিও তাদের কাছে গৌণ হয়ে যায়। জান্নাত হলো পুরস্কারদাতার অনুগ্রহ, আর পুরস্কার কখনো মুখ্য লক্ষ্য হতে পারে না। মুমিনের প্রতিটি কাজ হতে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির তাড়নায়। শরিয়তের পরিভাষায় নিয়তের এই পরিশুদ্ধিত অবস্থাকেই বলা হয় 'ইখলাস'। ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরাম এই ইখলাসের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত ছিলেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁদের সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, 'আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট, তারা আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট' (সুরা তাওবা, আয়াত: ১০০)।











