পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীকে এক জীবন্ত সত্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যখন আসমান থেকে বৃষ্টির পানি নেমে আসে, তখন মৃতপ্রায় ভূমি পুনরায় প্রাণ ফিরে পায় এবং সজীব হয়ে ওঠে। এই বিস্ময়কর প্রক্রিয়ার কথা ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তারপর তার দ্বারা মৃত পৃথিবীকে জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে বুদ্ধিমানদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আর-রুম, আয়াত: ২৪)। আধুনিক বিজ্ঞান ও ভূ-তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পৃথিবীর এই সজীবতা কেবল উপরিভাগের উদ্ভিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর গঠনগত বিন্যাস এবং মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা অণুজীবের এক বিশাল সাম্রাজ্যের ওপর নির্ভরশীল।
পৃথিবীর গঠন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি কয়েকটি সমকেন্দ্রিক স্তর নিয়ে গঠিত। এর সবচেয়ে ঘন এবং উত্তপ্ত অংশ হলো অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র বা কোর। অন্যদিকে, সবচেয়ে হালকা এবং পাতলা অংশ হলো পৃথিবীকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই স্তরগুলো একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তাদের সীমানায় তারা ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে, যা পৃথিবীর সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখে। পৃথিবীর কেন্দ্রে রয়েছে কোর, তার ওপরে অবস্থান করছে শিলামণ্ডল, এরপর জলমণ্ডল এবং সর্বশেষ স্তরে রয়েছে বায়ুমণ্ডল। এই শিলামণ্ডলটিই হলো সেই কঠিন স্তর, যা আমাদের বাসযোগ্য মহাদেশ এবং অতল সমুদ্র-মহাসাগরের তলদেশ গঠন করেছে। পৃথিবীর মোট ব্যাস প্রায় ১৩,০৭০ কিলোমিটার হলে, এই শিলামণ্ডলের গড় পুরুত্ব প্রায় ৩,২০০ কিলোমিটার। এই বিশাল শিলামণ্ডল মূলত আগ্নেয়, পাললিক ও রূপান্তরিত—এই তিন ধরনের শিলা দিয়ে গঠিত। তবে এই শিলাগুলো চিরকাল একই অবস্থায় থাকে না। দীর্ঘকাল ধরে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও ভাঙনের ফলে এগুলো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় এবং বিভিন্ন জৈব পদার্থের সঙ্গে মিশে এক বিশেষ স্তরের সৃষ্টি করে। এই সূক্ষ্ম এবং প্রাণবন্ত স্তরটিকেই আমরা সাধারণভাবে মাটি বলে থাকি। মাটির ঠিক নিচে থাকে উপমাটি (Subsoil), যা উপরের স্তরের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ভাঙা এবং যেখানে জৈব পদার্থের পরিমাণও অনেক কম থাকে। মাটি ও উপমাটি একত্রে পৃথিবীর শিলাস্তরের ওপর একটি সুরক্ষা কবচ বা আবরণের মতো কাজ করে।
এখন আমরা এই পাতলা মাটির স্তরের কিছু বিস্ময়কর ও জীবনদায়ী দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো এই মাটি। এটি এমন এক আশ্রয়স্থল, যেখানে বীজ অঙ্কুরিত হয়, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি পায় এবং অনুকূল পরিবেশের সহায়তায় বেড়ে উঠে প্রচুর ফসল দেয়। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, মাটি কেবল খনিজ পদার্থ, জৈব পদার্থ, পানি এবং কিছু গ্যাসের একটি সাধারণ মিশ্রণ। কিন্তু বাস্তবে এর গভীরতা এবং রহস্য অনেক বেশি। মাটি আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবের এক বিশাল আবাসস্থল। এর ভেতরে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ জটিল জৈব ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া সংঘটিত হয়, যা পুরো প্রকৃতির জীবনচক্রকে সচল রাখে। একটি ছোট্ট একখণ্ড জমিতেই উদ্ভিদের শিকড়, ছোট-বড় বিভিন্ন প্রাণী, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, প্রোটোজোয়া এবং অগণিত অণুজীব একসঙ্গে বসবাস করে। এদের সম্মিলিত ওজন কখনো কখনো কৃষিজ মাটির মোট ওজনের প্রায় এক-দশমাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এই বিশাল জীববৈচিত্র্যের কারণেই মাটিকে যথার্থই ‘জীবন্ত মাটি’ বলা হয়। এই বিপুল জীবসমাজের বেঁচে থাকার জন্য পানির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছি। তবু কি তারা ঈমান আনবে না?’ (সুরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৩০)।
মাটির ভেতরে বসবাসকারী এই অণুজীবদের মধ্যে অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সম্পর্কের ধরনও পরিবর্তিত হয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় জীববৈজ্ঞানিক ভারসাম্য। এই সম্পর্কগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো সহযোগিতামূলক সম্পর্ক, যার মধ্যে নিরপেক্ষতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহাবস্থান অন্তর্ভুক্ত। কখনো দুটি জীব এমনভাবে পাশাপাশি বাস করে যে, কেউ কারো উপকার বা অপকার করে না—এটি একটি নিরপেক্ষ সম্পর্ক। আবার কখনো একটি জীব অন্যটির জন্য খাদ্য প্রস্তুত করে দেয় অথবা পরিবেশের বিষাক্ত পদার্থ ভেঙে তাকে সাহায্য করে—একে বলা হয় সহযোগিতামূলক সম্পর্ক। কিছু ক্ষেত্রে দুটি জীব পরস্পরের উপকার করে এবং একে অপরের বৃদ্ধি নিশ্চিত করে, যাকে পারস্পরিক সহাবস্থান বা সহমর্মিতা বলা হয়।
মাটির অণুজীবদের মধ্যে সহযোগিতার বহু চমকপ্রদ উদাহরণ রয়েছে। কিছু জীব অক্সিজেন ছাড়া বাঁচতে পারে না (বায়বীয়), আবার কিছু জীবের জন্য অক্সিজেনই বিষস্বরূপ (অবায়বীয়)। বায়বীয় জীবেরা অক্সিজেন ব্যবহার করে পরিবেশ থেকে তা কমিয়ে দেয়, যার ফলে অবায়বীয় জীবেরা সহজে বেঁচে থাকতে পারে। এখানে অবায়বীয় জীব উপকৃত হলেও বায়বীয় জীব সরাসরি কোনো লাভ পায় না। এছাড়া কিছু অণুজীব জটিল জৈব পদার্থ ভেঙে সহজ যৌগে পরিণত করে, যা অন্য জীব খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে। আবার কিছু জীব বিষাক্ত পদার্থ ভেঙে মাটিকে অন্য জীবের জন্য নিরাপদ করে তোলে। উদ্ভিদের শিকড়ের চারপাশের অঞ্চল, যাকে রাইজোস্ফিয়ার (Rhizosphere) বলা হয়, সেখানে উদ্ভিদ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান নিঃসরণ করে। এর ফলে ওই অঞ্চলে অণুজীবের সংখ্যা আশপাশের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক বেশি হয়। কখনো এই সহযোগিতা এতটাই গভীর হয় যে, এক জীব অন্যটিকে ছাড়া বাঁচতেই পারে না। যেমন—কিছু সবুজ শৈবাল আলোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে Azotobacter ব্যাকটেরিয়াকে দেয়, আর ব্যাকটেরিয়া বাতাসের নাইট্রোজেন স্থির করে শৈবালকে সরবরাহ করে। ডালজাতীয় উদ্ভিদ ও Rhizobium ব্যাকটেরিয়ার সম্পর্কও এর এক অনন্য উদাহরণ। ব্যাকটেরিয়া উদ্ভিদের শিকড়ে গুটি (Nodule) তৈরি করে এবং বাতাসের নাইট্রোজেন স্থির করে উদ্ভিদকে দেয়, বিনিময়ে উদ্ভিদ তাকে কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে। এই পারস্পরিক আদান-প্রদান ছাড়া এই জীবনচক্র সম্পূর্ণ হওয়া অসম্ভব। এছাড়া কিছু ছত্রাক উদ্ভিদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাইকোরাইজা (Mycorrhiza) গঠন করে, যা উদ্ভিদকে মাটি থেকে পানি ও পুষ্টি উপাদান শোষণে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, মাটিতে বিরোধমূলক সম্পর্কও বিদ্যমান, যার মধ্যে প্রতিযোগিতা, বৈরিতা ও পরজীবিতা অন্তর্ভুক্ত। জীবেরা স্থান, খাদ্য ও অক্সিজেনের জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করে। অনেক সময় একটি জীব মাটির অম্লতা বা অক্সিজেনের পরিমাণ পরিবর্তন করে নিজের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী জীবের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। অনেক জীব অন্য জীবকে সরাসরি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। যেমন—প্রোটোজোয়া ব্যাকটেরিয়া খায়, অনেক পোকামাকড় ছত্রাক খায়, কিছু ছত্রাক নেমাটোড কৃমিকে হত্যা করে এবং কিছু ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও প্রাণীর কোষ ধ্বংস করে। বিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি হলো বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বা অ্যান্টিবায়োটিক নিঃসরণ। অনেক অণুজীব এমন পদার্থ তৈরি করে, যা প্রতিদ্বন্দ্বী জীবকে মেরে ফেলে বা তাদের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। কখনো কখনো কোনো জীব নিজেরই বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী পদার্থও উৎপন্ন করে।
এই সহযোগিতা ও বিরোধ—উভয় দিক থেকেই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, মহান আল্লাহ প্রতিটি জীবকে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত ক্ষমতা ও উপায় দান করেছেন। এসব জটিল সম্পর্কের সমন্বয়েই প্রকৃতির জীবনচক্র নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে—যেখানে কোনো ঘাটতি নেই, আবার কোনো অতিরিক্ততাও নেই। এই নিখুঁত ভারসাম্যই প্রমাণ করে যে, মহাবিশ্বের সবকিছু এক মহান পরিকল্পনাকারীর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এ কারণেই মহান আল্লাহ সত্য বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক বস্তু একটি নির্ধারিত পরিমাপ অনুযায়ী সৃষ্টি করেছি।’











