তাকওয়া: মুমিনের জীবনের মূল শক্তি ও পরকালীন মুক্তির একমাত্র পথ
ইসলামি জীবন দর্শনে তাকওয়া কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি ঈমানের মূল শক্তি, আমলের প্রাণ এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য ও জান্নাত লাভের প্রধান মাধ্যম। একজন মুমিনের জন্য তাকওয়া অবলম্বন করা কেবল পছন্দনীয় বিষয় নয়, বরং প্রকৃত মুমিন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তাকওয়ার উচ্চস্তরে পৌঁছানো অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে মহান আল্লাহ যখন মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলির আলোচনা করেছেন, প্রায় সবখানেই তিনি তাকওয়া অবলম্বনের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।
তাকওয়া মূলত একটি আরবি শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো আত্মরক্ষা করা, নিষ্কৃতি লাভ করা কিংবা ভয় করা। আধ্যাত্মিক পরিভাষায়, আল্লাহর ভয় এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষায় যাবতীয় অন্যায়, অপরাধ এবং আল্লাহর নিষিদ্ধ সকল কাজ ও কথা থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং বাঁচিয়ে রাখার নামই হলো তাকওয়া। তাকওয়ার এই গভীর অর্থটি আরও সহজভাবে বোঝার জন্য আমরা প্রখ্যাত সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর একটি চমৎকার উপমার আশ্রয় নিতে পারি। একবার হযরত ওমর (রা.) সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে তাকওয়ার প্রকৃত সংজ্ঞা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। জবাবে উবাই ইবনে কাব (রা.) তাঁকে প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে হেঁটেছেন?” ওমর (রা.) উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, হেঁটেছি।” তখন উবাই ইবনে কাব (রা.) জানতে চাইলেন, তিনি সেই পথটি কীভাবে অতিক্রম করেছিলেন? ওমর (রা.) বললেন, “আমি আমার কাপড় গুটিয়ে নিয়ে অতি সাবধানতার সঙ্গে হেঁটেছিলাম, যাতে কোনো কাঁটা আমার গায়ে না বিঁধে যায়।” তখন উবাই ইবনে কাব (রা.) বললেন, “ঠিক এটাই হলো তাকওয়া।” (তাফসিরে ইবনে কাসির)
অর্থাৎ, কাঁটাযুক্ত পথে একজন মানুষ যেমন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলে যাতে কাঁটা বিঁধতে না পারে, ঠিক তেমনি একজন মুমিন যখন আল্লাহর শাস্তির ভয় এবং তাঁর ভালোবাসার প্রত্যাশায় নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে দূরে রাখেন এবং নেক আমলে অবিচল থাকেন, তাকেই বলা হয় তাকওয়া। আমাদের বাস্তব জীবনেও প্রতিনিয়ত অসংখ্য ‘কাঁটাযুক্ত’ পথের মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান যুগের সুদ, ঘুষ, চোখের জিনা, মিথ্যাচার এবং প্রতারণার মতো সামাজিক ও ব্যক্তিগত পাপগুলোই হলো সেই কাঁটা। যার অন্তরে তাকওয়ার নূর বিদ্যমান, তিনি এই সব ফিতনা ও পাপের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন। আর যার হৃদয়ে তাকওয়ার অভাব, তিনি খুব সহজেই পাপে জড়িয়ে পড়েন, যার পরিণতি পরকালে হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
মহান আল্লাহ মুত্তাকিদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে অগ্রসর হও, যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান। তা প্রস্তুত করা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৩৩)। এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, জান্নাত মূলত সেইসব বান্দাদের জন্য সংরক্ষিত, যারা জীবনে তাকওয়া অবলম্বন করেছেন। আল্লাহর কাছে প্রিয় ও সম্মানিত হওয়ার একমাত্র মাপকাঠি হলো এই তাকওয়াই। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে-ই বেশি সম্মানিত, যে অধিক মুত্তাকি।’ (সুরা হুজরাত, ১৩)। অর্থাৎ, যার তাকওয়া যত বেশি, আল্লাহর কাছে তাঁর মর্যাদা তত উচ্চ এবং জান্নাতে প্রবেশ করবেন সেইসব প্রিয় বান্দারাই যারা মুত্তাকি হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছেন।
সাধারণত মানব সমাজে শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড হিসেবে বংশমর্যাদা, অগাধ সম্পদ, বাহ্যিক সৌন্দর্য, ক্ষমতা, উচ্চশিক্ষা কিংবা সামাজিক অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহর দরবারে এসবের কোনো মূল্য নেই। তিনি বান্দার বাহ্যিক রূপ বা ধন-সম্পদ দেখেন না। এই সত্যটি নিশ্চিত করতে নবীজি (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের চেহারা বা আকৃতির দিকে কিংবা তোমাদের ধনসম্পদের দিকে তাকান না; তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে।” (মুসলিম)।
ইসলামি চিন্তাবিদগণ কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে তাকওয়াকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করেছেন। প্রথম স্তরটি হলো শিরক বর্জন করে একনিষ্ঠভাবে ঈমান আনা, যা একজন মানুষকে জাহান্নামের চিরস্থায়ী আজাব থেকে মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়। দ্বিতীয় স্তরটি হলো জীবনের সব ধরনের গুনাহ এবং অশ্লীল কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং ইসলামের মৌলিক বিধানগুলো যথাযথভাবে পালন করা। আর তৃতীয় ও সর্বোচ্চ স্তরটি হলো সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকেও নিজেকে দূরে রাখা। অর্থাৎ, কোনো কাজে হারামে লিপ্ত হওয়ার সামান্যতম আশঙ্কা থাকলে, সেই বৈধ কাজটিও পরিহার করা। এটি মূলত নবী-রসুল এবং সিদ্দীকিনদের উচ্চতর স্তর।
পরিশেষে বলা যায়, তাকওয়া হলো সেই আলোকবর্তিকা যা মানুষকে জান্নাতের সোপানে পৌঁছে দেয়। কারণ জান্নাত মূলত সৃষ্টিই করা হয়েছে তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য। এই গুণটিই মানুষকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করে এবং যাবতীয় মন্দ পথ থেকে দূরে রাখে। তাই পরকালে নাজাত এবং চিরস্থায়ী সুখ লাভের জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই মুত্তাকি বান্দা হওয়া জরুরি। আসুন, আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকওয়ার চর্চা করি এবং মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার আন্তরিক চেষ্টা করি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই কঠিন পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন।











