বাংলাদেশে ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রসারের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানগত তথ্যে দেখা গেছে, মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেটের ব্যবহারের হার আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত ‘আইসিটি প্রয়োগ ও ব্যবহার জরিপ ২০২৫-২৬’-এর তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) ফলাফল বিশ্লেষণে এই আশাব্যাঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৮৯.৫ শতাংশ ব্যক্তি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ৬৫.৪ শতাংশ ব্যক্তির নিজস্ব মোবাইল ফোন রয়েছে। ইন্টারনেটের প্রসারের ক্ষেত্রেও বড় সাফল্য এসেছে; বর্তমানে দেশের ৫৮.৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন এবং ১১.৭ শতাংশ ব্যক্তি কম্পিউটার ব্যবহারের সাথে যুক্ত।
কেবল ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, খানা বা পরিবার পর্যায়েও প্রযুক্তির বিস্তার অত্যন্ত স্পষ্ট। দেশের ৯৮.৯ শতাংশ পরিবারের অন্তত একটি মোবাইল ফোন রয়েছে এবং ৭৩.৪ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ৫৭.৪ শতাংশ পরিবারে ইন্টারনেট সংযোগ এবং ৯৮.৫ শতাংশ পরিবারে বিদ্যুতের সুবিধা পৌঁছেছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যমাত্রার সাথে সংগতিপূর্ণ।
চলতি অর্থবছরের বিভিন্ন প্রান্তিকের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। প্রথম প্রান্তিকে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হার ছিল ৮০.৬ শতাংশ, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে হয় ৮৯.৪ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে তা দাঁড়িয়েছে ৮৯.৫ শতাংশে। নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানার ক্ষেত্রে প্রথম প্রান্তিকে হার ছিল ৫৬.৫ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে ৬৫.৫ শতাংশ হলেও তৃতীয় প্রান্তিকে সামান্য হ্রাস পেয়ে ৬৫.৪ শতাংশ হয়েছে। কম্পিউটার ব্যবহারের হার প্রথম প্রান্তিকে ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১১.৪ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ১১.৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় লাফ দেখা গেছে; প্রথম প্রান্তিকে এই হার ছিল ৪৮.৯ শতাংশ, যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৫৮.৪ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৫৮.৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় মোবাইল ফোন ব্যবহার ৮৮.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৯.৫ শতাংশে এবং নিজস্ব মোবাইল ফোনের মালিকানা ৬৪.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫.৪ শতাংশে পৌঁছেছে। কম্পিউটার ব্যবহারের হার ১১.৩ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১১.৭ শতাংশ। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে ইন্টারনেট ব্যবহারে, যা এক বছরে ৫৩.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৮.৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
পরিবার পর্যায়ের অন্যান্য ডিভাইসের ব্যবহারের তথ্যে দেখা গেছে, তৃতীয় প্রান্তিকে ১৫.১ শতাংশ পরিবারের রেডিও এবং ৫৮.৮ শতাংশ পরিবারের টেলিভিশন রয়েছে। ৯.০ শতাংশ পরিবারে কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৯৮.২ শতাংশ পরিবারে শুধু মোবাইল ফোন রয়েছে এবং মাত্র ০.৭ শতাংশ পরিবারে স্থায়ী (ফিক্সড) ও মোবাইল—উভয় ধরনের ফোনের সুবিধা রয়েছে। স্থায়ী টেলিফোনের ব্যবহার এখন তলানিতে, যা মাত্র ০.৭ শতাংশ পরিবারে সীমাবদ্ধ।
বিবিএসের বাস্তবায়নধীন ‘ব্যক্তি ও খানা পর্যায়ে জেলা ভিত্তিক আইসিটি ব্যবহারের সুযোগ ও প্রয়োগ পরিমাপ’ প্রকল্পের আওতায় এই বিস্তৃত জরিপটি পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৩ সালে প্রথমবার মডিউলার সার্ভের অংশ হিসেবে আইসিটি জরিপ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০২২ ও ২০২৩ সালে পৃথক জরিপের মাধ্যমে আইসিটি সূচক প্রকাশ করা হয় এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নকে (আইটিইউ) ১৯টি সূচকের তথ্য প্রদান করা হয়।
বর্তমান জরিপটি কম্পিউটার অ্যাসিসট্যান্ড পারসোনাল ইন্টারভিউয়িং (সিএপিআই) পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। বছরে চারটি প্রান্তিকে তথ্য সংগ্রহের পর তিনটি মূল প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আইটিইউ-কে মোট ২২টি সূচকের তথ্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এই জরিপে পাঁচ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সি নারী-পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলার ২ হাজার ৫৬৮টি নির্বাচিত নমুনা এলাকায় প্রতি প্রান্তিকে ২৪টি করে মোট ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পুরো বছরে মোট ২ লাখ ৪৬ হাজার ৫২৮টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য ৬৪ জেলায় ২১৪ জন প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারী মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন।











