শৈশবে বাবাকে হারিয়ে থেমে গিয়েছিল পড়াশোনা। বই-খাতার বদলে অল্প বয়সেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল সংসারের কঠিন দায়িত্ব। এরপর পেরিয়ে গেছে কয়েক দশক। সংসার আর পরিবার সামলানোর ব্যস্ততায় চাপা পড়েছিল নিজের লালিত স্বপ্ন। তবু শিক্ষার প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা কখনো হারিয়ে যায়নি। সেই অদম্য স্বপ্ন পূরণে ৪৮ বছর বয়সে আবারও বই হাতে তুলে নেন শেফালী বেগম। অবশেষে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার এই নারীর সাফল্যে আনন্দে ভাসছে তার পরিবার ও এলাকাবাসী। শেফালীর এই অর্জন কেবল একটি পরীক্ষায় পাস করার গল্প নয়, এটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হৃদয়ে লালন করা স্বপ্ন পূরণের কাহিনি। বয়স, সংসার কিংবা পারিবারিক দায়িত্ব যে শিক্ষার পথে চূড়ান্ত বাধা হতে পারে না, নিজের জীবন দিয়ে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।
শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। ছোটবেলায় পড়াশোনায় বেশ মেধাবী ছিলেন তিনি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থানও পেয়েছিলেন। কিন্তু শৈশবেই বাবাকে হারানোর পর পরিবারে নেমে আসে ঘোর সংকট। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একসময় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় তার পড়াশোনা। বই-খাতা ছেড়ে নিতে হয় সংসারের দায়িত্ব। পরে স্বামী, সন্তান ও পরিবারের দেখভাল করতেই কেটে যায় জীবনের দীর্ঘ সময়।
তবে পড়াশোনার প্রতি ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি। একপর্যায়ে স্বামী ও তিন সন্তানের অনুপ্রেরণায় ৪৮ বছর বয়সে আবারও পড়াশোনা শুরু করার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন শেফালী। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন করে বই হাতে নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। বয়সের ব্যবধান, সংসারের ব্যস্ততা আর পড়াশোনার দীর্ঘ ছেদ সবকিছু সামলে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। অবশেষে সেই কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি মিলেছে পরীক্ষার ফলে।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মূল জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ অর্জন করে উত্তীর্ণ হয়েছেন শেফালী। তিনি গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
শেফালীর এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত তার পরিবারের সদস্যরা। তার মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।
গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছেই হার মানে। তার সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করি। আজ ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
শেফালীর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু বলেন, শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।
শেফালীর নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজের কাছেও দাদি এখন বড় অনুপ্রেরণা। সে বলে, আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি চিকিৎসক হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।
দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে শেফালীর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে সংসারের দায়িত্ব, আর্থিক সংকট কিংবা পারিবারিক নানা প্রতিকূলতায় যেসব নারী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন, তাদের জন্য শেফালীর এই সাফল্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।



















