ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে অন্তত ৫৮টি বিমান অভিযান চালিয়েছে সৌদি আরব। হুথি গোষ্ঠীর সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারী দাবি করেছেন, শনিবার রাত থেকে শুরু করে রবিবার রাত পর্যন্ত এই ব্যাপক অভিযানগুলো পরিচালিত হয়েছে। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় ইয়াহিয়া সারী এই হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রদান করেন।

হুথিপন্থি ইয়েমেনি টেলিভিশন চ্যানেল আল-মাসিরাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ইয়েমেনের সা’দা ও মোনাব্বিহ জেলা এবং আল-জাওফ প্রদেশে এসব বিমান হামলা চালানো হয়েছে। এই এলাকাগুলো হুথি বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটি হিসেবে সুপরিচিত। মূলত গত ১২ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের সারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের চালানো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার একটি শক্তিশালী পাল্টা জবাব হিসেবেই সৌদি বিমানবাহিনী এই অভিযানগুলো পরিচালনা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হুথিদের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিমান অভিযান চালিয়ে আসছে সৌদি আরব। রবিবারের আগ পর্যন্ত সৌদি বিমানবাহিনী ইয়েমেনে মোট ১৩০টিরও বেশি পৃথক অভিযান পরিচালনা করেছে। এদিকে, ইয়েমেনের জাতীয় সেনাবাহিনীও উত্তর ইয়েমেন ও রাজধানী সানাকে হুথিদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে নিজেদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক এই বড় ধরনের বিমান হামলা নিয়ে ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য বা বিবৃতি পাওয়া যায়নি।

এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের এই বিমান অভিযানগুলো এখন পর্যন্ত মূলত সম্মুখসারিতে অবস্থানরত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। রাজধানী সানাসহ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মূল প্রশাসনিক ও কৌশলগত কেন্দ্রগুলোকে এখনো এসব হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে সৌদি আরব ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাতের মাত্রা বহুগুণ বেড়েছে। এর আগে বেশ কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চেষ্টা করেছিল হুথিরা। গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে লোহিত সাগর ও এডেন সাগরকে সংযুক্তকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে হুথিরা। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই প্রণালির গুরুত্ব ও কৌশলগত অবস্থান বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায়, বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশের জ্বালানি পরিবহনের একটি বিশাল অংশ পরিচালিত হয়।

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলমান রয়েছে। ওই বছর ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে ইরান-সমর্থিত হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে নেয়। রাজধানী দখলের পর ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি জীবন বাঁচাতে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে এবং দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ২০১৫ সাল থেকেই সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে ব্যাপক অভিযান শুরু করে। বর্তমানে ইয়েমেনের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বাকি অংশটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি-সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকার নিয়ন্ত্রণ করছে।

সূত্র: এএফপি