পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে এক অসহায় বিধবার সরকারি ভাতার টাকা দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর ধরে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে চলে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। প্রশাসনের পরিচালিত তদন্তে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, ভুক্তভোগীর প্রাপ্য ভাতার টাকা নিয়মিতভাবে ওই নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা নিয়মবহির্ভূতভাবে উত্তোলন করা হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে দেবীগঞ্জের টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়া এলাকায়। ওই এলাকার বাসিন্দা মোছাঃ রহিমা বেগম দীর্ঘ সময় ধরে তার বিধবা ভাতার টাকা পাননি। অভিযোগ উঠেছে, তার প্রাপ্য ভাতার টাকা তার নিজস্ব মোবাইল নম্বরে না গিয়ে ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ আব্দুল খালেকের ব্যবহৃত নম্বরে চলে যাচ্ছিল। বিষয়টি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসনের নজরে আসে এবং দ্রুত তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মোঃ আব্দুল খালেক টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সর্বশেষ কমিটির সহ-সভাপতি এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে গত ৩০ আগস্ট দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইন্দ্রজিৎ সাহা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ আবু রায়হানকে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের প্রেক্ষিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে গত ৮ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ আবু রায়হান জানান, অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মোবাইল নম্বরটির ট্রানজ্যাকশন হিস্ট্রি বা লেনদেনের ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, নিয়মিতভাবে বিধবা ভাতার টাকা ওই নম্বরে জমা হতো এবং নিয়মিত বিরতিতে সেই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তবে তদন্তের আরও গভীরে গিয়ে বিস্তারিত তথ্যের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভুক্তভোগী রহিমা বেগম জানান, তিনি সর্বশেষ ২০২০ সালের জুলাই মাসে তার বিধবা ভাতার টাকা উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে যখন জিটুপি (G2P) পদ্ধতিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভাতা প্রদানের আধুনিক ব্যবস্থা চালু হয়, তখন থেকে তিনি আর কোনো টাকা পাননি। দীর্ঘ সময় টাকা না পেয়ে তিনি যখন উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন, তখন জানতে পারেন তার নামে বরাদ্দকৃত ভাতার টাকা একটি সম্পূর্ণ অপরিচিত 'নগদ' অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে।
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রহিমা বেগমের বিধবা ভাতার টাকা এমআইসি (MIC) সফটওয়্যারের মাধ্যমে ০১৯১৭-৩৬৭৪৯২ নম্বরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসেও তার নামে ১ হাজার ৯৬১ টাকা ওই নম্বরে পাঠানো হয়। অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ছয় বছরে মোট প্রায় ৪০ হাজার টাকা ভাতা ওই নির্দিষ্ট নম্বরে পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তের আরও গভীরে গিয়ে দেখা গেছে, ওই নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বরটি ইউপি সদস্য মোঃ আব্দুল খালেকের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের মাধ্যমে 'নগদ' অ্যাকাউন্ট খোলার সাথে সরাসরি যুক্ত। তবে এই গুরুতর অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুল খালেক দাবি করেছেন, কীভাবে তার নম্বরটি সেখানে যুক্ত হলো তা তিনি জানেন না। তিনি আরও দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট সিম কার্ডটি প্রায় চার বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল। তবে সিম হারানোর বিষয়ে তিনি থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেননি বলে স্বীকার করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার পর এখন প্রশাসনের পরবর্তী কঠোর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন ভুক্তভোগী রহিমা বেগম। এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ সাহা বলেন, ‘আমি তদন্ত প্রতিবেদনটি পেয়েছি এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি। দোষীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’















