ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দমনে এক নজিরবিহীন কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে, আঞ্চলিক মিত্র এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের কাছে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। ইসরায়েলের প্রভাবশালী সংবাদপত্র 'হাইয়োম' তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, যুদ্ধের ময়দানে সৌদি সমর্থিত বাহিনীগুলোর একের পর এক ব্যর্থতা এবং বিপর্যয়ের মুখে এই চরম পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে সৌদি আরব।

প্রতিবেদনটিতে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিসরসহ অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে সৌদি আরব সরাসরি সহায়তার আবেদন জানালেও, ইসরায়েলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সতর্ক পথ বেছে নিয়েছে। সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় মার্কিন সেন্টকমকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই পরোক্ষ যোগাযোগের মূল লক্ষ্য হলো, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হাত থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করা। এই কৌশলগত জলপথটি পুরোপুরি হুতিদের দখলে চলে গেলে আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল এবং বিশ্ববাণিজ্যে চরম বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই পরিস্থিতির গুরুত্ব সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক। তিনি মনে করেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালি যদি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তা পুরো অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে যে পরিমাণ ক্ষতি করবে, তা হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতার পর থেকে সৌদি আরব তাদের তেল রপ্তানির জন্য ইয়ানবু বন্দর এবং লোহিত সাগরের রুট ব্যবহার করে আসছিল। এই রুটটি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

রিয়াদের এই গোপন যোগাযোগ প্রচেষ্টাকে কূটনৈতিক মহলে এক অভূতপূর্ব মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, দীর্ঘকাল ধরে সৌদি আরব প্রকাশ্যে এই অবস্থান বজায় রেখেছে যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব নয়। এমনকি সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধের চরম উত্তেজনার সময়েও রিয়াদ তাদের এই কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছিল। তবে বর্তমান নিরাপত্তা সংকট সৌদি যুবরাজকে তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে ইসরায়েলের কাছাকাছি আসার এক সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছে বলে মনে করছে 'হাইয়োম'। একই সঙ্গে, এই কৌশলটি তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধীদের মোকাবিলা করার জন্য একটি কার্যকর রাজনৈতিক চাল হিসেবে কাজ করতে পারে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সিবিএস নিউজসহ আরও কিছু মাধ্যম জানিয়েছে যে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিকবার সরাসরি কথা বলেছেন। এই আলাপচারিতার মূল বিষয় ছিল আনসারুল্লাহ বা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক অভিযানের আহ্বান জানানো। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সরাসরি বড় ধরনের সামরিক হস্তক্ষেপে রাজি না হয়ে কেবল প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এই সমন্বিত সহায়তার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার ইতোমধ্যে সৌদি আরব সফর করেছেন। ওয়াশিংটন বর্তমানে বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের কৌশলগত এলাকাগুলোতে বিমান হামলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তবে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে আনসারুল্লাহ বাহিনী ওই অঞ্চলে কতটুকু রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে তার ওপর ভিত্তি করে।

এই চরম সংকটের মুহূর্তে রিয়াদের প্রতিরক্ষা জোটের ভেতরে ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র এক মাস আগে সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও পাকিস্তান ও তুরস্ক এই সামরিক সংঘাতের সরাসরি অংশ হতে রাজি হয়নি। তারা কেবল মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে মিসরের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। কায়রো রিয়াদের এই পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। কারণ মিসর জানে, বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হলে সুয়েজ খালের মাধ্যমে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে, যা মিসরের জাতীয় রাজস্বের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে।