কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং লোহার গরাদের অন্তরালে বন্দি জীবন কাটছিল ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ভারতের সাবেক এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের। নিয়ম অনুযায়ী, উচ্চনিরাপত্তাযুক্ত সেলে তার প্রতিটি মুহূর্ত থাকার কথা ছিল কড়া নজরদারিতে। তবে বাস্তব চিত্রটি ছিল একেবারেই ভিন্ন এবং চাঞ্চল্যকর। সাধারণ বন্দিদের জন্য যেখানে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের প্রতিটি পদক্ষেপ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, সেখানে নিজের নির্জন সেলে আয়েশি ভঙ্গিতে নিষিদ্ধ ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি। সম্প্রতি সেই জব্দকৃত ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য, যা পুরো কারা প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে। ধর্ষণের দায়ে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত জনতা দল (সেক্যুলার)-এর সাবেক সংসদ সদস্য প্রজ্বল রেভান্নার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কয়েক ডজন পর্নোগ্রাফিক ভিডিও পাওয়া গেছে। সম্প্রতি ফরেনসিক বিশ্লেষণের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) এনডিটিভি-র এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের কথা জানানো হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১১ আগস্ট, যখন বেঙ্গালুরুর পারাপ্পানা অগ্রহারা কেন্দ্রীয় কারাগারে ক্রাইম ব্রাঞ্চের একটি বিশেষ দল আকস্মিক তল্লাশি অভিযান চালায়। উচ্চনিরাপত্তাযুক্ত ব্যারাকে বন্দি থাকা প্রজ্বল রেভান্নাকে সে সময় তার সেলের ভেতরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখেন কর্মকর্তারা। তাৎক্ষণিকভাবে চালানো ওই তল্লাশিতে তার সেল থেকে একটি মোবাইল ফোন ছাড়াও একটি চার্জার, একটি পেনড্রাইভ এবং একটি নোটবুক জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে জব্দকৃত ফোন ও পেনড্রাইভটি বিস্তারিত পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়। ল্যাব রিপোর্ট অনুযায়ী, তার ব্যবহৃত মোবাইলে ডজনখানেক পর্নোগ্রাফিক ভিডিও সংরক্ষিত ছিল এবং উদ্ধার হওয়া পেনড্রাইভে ছিল একাধিক ওয়েব সিরিজ।

উল্লেখ্য যে, ভারতের যেকোনো কারাগারের অভ্যন্তরে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন, সিম কার্ড কিংবা যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ডিভাইসের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নিয়ম অনুযায়ী, বন্দিদের বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কেবল নিবিড় নজরদারিতে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক ল্যান্ডলাইন, পাবলিক কল অফিস (পিসিও) অথবা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ভিডিও-কলিং ব্যবস্থার সুযোগ পাওয়ার কথা। তবে রেভান্নার কাছ থেকে এসব নিষিদ্ধ সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনাটি বেঙ্গালুরুর কেন্দ্রীয় কারাগারে তথাকথিত ‘ভিআইপি’ বন্দিদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে এক উচ্চপদস্থ কারা কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

প্রজ্বল রেভান্না ভারতের অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়ার নাতি এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামীর ভাতিজা। বর্তমানে তিনি একটি গুরুতর ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন। গত বছর ৪৮ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণ এবং সেই যৌন নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ভুক্তভোগী নারীটি হাসান জেলার হোলেনারাসিপুরায় রেভান্না পরিবারের ফার্মহাউসে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে প্রজ্বল রেভান্না তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন এবং সেই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে রাখেন। পরবর্তীতে ওই ভিডিওগুলো প্রকাশ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন ও ব্ল্যাকমেইল করা হতো। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সেই মামলার চূড়ান্ত বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়ে বর্তমানে তিনি কারাবন্দি। তবে কারাগারে থেকেও তার এই বিলাসবহুল ও নিয়মবহির্ভূত জীবনযাপন প্রমাণ করে যে, আইনের চোখে সবাই সমান হলেও প্রভাবশালী বন্দিদের জন্য কারাগারের নিয়মগুলো অনেক সময় শিথিল হয়ে পড়ে।