ফরিদপুরের নগরকান্দায় যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী কহিনুর বেগমকে নির্মমভাবে হত্যার দায়ে স্বামী লিটন মিয়া ওরফে লিটুকে (৫০) যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছে আদালত। একই সাথে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

এর পাশাপাশি, নিহতের মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে লুকিয়ে রাখার অভিযোগে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় তাকে আরও তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এই জরিমানার টাকা অনাদায়ে তাকে আরও এক মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে আদালত উল্লেখ করেছেন যে, আসামি উভয় সাজা একসঙ্গে ভোগ করতে পারবেন।

ফরিদপুরের বিশেষ দায়রা জজ ও বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) অশোক কুমার দত্ত আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুর দেড়টার দিকে এই রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামি লিটন মিয়া আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। ফলে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।

মামলার এজাহার এবং আদালত সূত্রে জানা গেছে, নগরকান্দার লস্করদিয়া ইউনিয়নের শশা উত্তরপাড়া এলাকার মৃত আলাউদ্দিন মিয়ার ছেলে লিটন মিয়ার সঙ্গে প্রায় ১৬ বছর আগে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন কহিনুর বেগম। তাদের দাম্পত্য জীবনে দুটি সন্তান জন্ম নেয়। তবে বিয়ের পর থেকেই সুখের দিন শেষ হয়ে যায় কহিনুরের। যৌতুক এবং পারিবারিক নানা বিষয় নিয়ে লিটন ও তার পরিবারের সদস্যরা কহিনুরকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতে শুরু করেন। যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারায় এই নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, এক পর্যায়ে কহিনুরকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে করেন লিটন। এরপর থেকে কহিনুর ও তার সন্তানদের বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। এমনকি বাড়ি না ছাড়লে তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হতো।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২১ সালের ৭ এপ্রিল রাতে। ওই রাতে কহিনুর তার মেয়েকে নিয়ে একই ঘরে ঘুমাতে যান। রাত সাড়ে ১২টার দিকে মেয়ের ঘুম ভেঙে গেলে সে তার মাকে বিছানায় দেখতে পায় না। সে দ্রুত পাশের ঘরে থাকা তার ভাইকে বিষয়টি জানায়। পরদিন ভোরে পরিবারের সদস্যরা লিটনের বাড়ির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত পুকুরের উত্তর পাড়ে কহিনুরের নিথর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নিহতের ভাই মো. রহমতউল্লাহ বাদী হয়ে ২০২১ সালের ১১ জুন স্বামী লিটন মিয়াসহ নয়জনকে সরাসরি এবং অজ্ঞাতনামা আরও পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে নগরকান্দা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ২১ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরকান্দা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবুল কালাম আজাদ কেবল স্বামী লিটন মিয়াকেই অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি আজিজুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তথ্যের ভিত্তিতে আসামির বিরুদ্ধে স্ত্রী হত্যার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আদালত সব ধরনের প্রমাণ ও নথি পর্যালোচনা করে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। আমরা আদালতের এই রায়ে সন্তুষ্ট।"