বিনা দরপত্রে ১৮টি সরকারি বাড়ি বিক্রির মাধ্যমে ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকার বিশাল অংকের দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা ১৫টি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মির্জা আব্বাস। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এর বিচারক মুহাম্মদ কামরুল হাসান খান এই রায় প্রদান করেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মির্জা আব্বাসসহ মোট ২১ জনকে আসামি করে পৃথক ১৫টি মামলা দায়ের করেছিল। এই মামলাগুলোর মধ্যে মির্জা আব্বাসসহ আরও ১২ জন ব্যক্তিকে প্রতিটি মামলায় আসামি করা হয়। অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন এস এম জাফর উল্লাহ, মো. এমদাদুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী, গোলাম নবী, কাজী রিয়াজুল মনির, জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আব্দুস সাদেক, হুমায়ন খান, মীর মোশাররফ হোসেন, ইকবাল উদ্দিন চৌধুরী এবং মো. শহীদ আলম। এছাড়া আরও কয়েকজন ব্যক্তি পৃথক মামলায় আসামি হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ছিলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী (এক মামলায়), আহমেদ আকবর সোবহান (দুই মামলায়), মেহেদী হাসান, শফিকুর রহমান কিরন, নুরুচ্ছাফা, মো. শুকুর মিয়া, হাসনা আহমেদ এবং আলী হায়দার চৌধুরী। আদালতের রায় অনুযায়ী, অভিযুক্ত এই সকল ব্যক্তিই সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো থেকে খালাস পেয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ, যখন দুদক প্রথম এই মামলাগুলো দায়ের করে। দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া শেষে যখন অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়, তখন ওই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন বিচারক শাহেদ নূরউদ্দিন আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করেন।
মামলার এজাহারে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয় যে, ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশান, ধানমন্ডি এবং শান্তিনগরে অবস্থিত মোট ১৮টি পরিত্যক্ত সরকারি বাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল গুলশানের রোড নম্বর-৫৩ এর বাড়ি নম্বর এনডব্লিউ (আই)-৬, রোড নম্বর-৮৯ এর বাড়ি নম্বর কে-৬, রোড নম্বর-১১৩ এর বাড়ি নম্বর সিএনজি-১৬ এবং বাড়ি নম্বর বি-৫। এছাড়া ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার রোড নম্বর-২ এর বাড়ি নম্বর-১২০ এবং বাড়ি নম্বর-১৩৯, রোড নম্বর-১২ এর বাড়ি নম্বর-৫৪০/এ (পুরাতন) এবং বাড়ি নম্বর-৫৪০/বি (পুরাতন), রোড নম্বর-১৪ (পুরাতন) এর বাড়ি নম্বর-৭২৩/এ (পুরাতন) এবং বাড়ি নম্বর-৭২৩/বি, এবং ধানমন্ডির কলেজ স্ট্রিটের ১৭ ও ১৮ নম্বর বাড়ি। সেই সাথে শান্তিনগরের নওরতন কলোনির বাড়ি নম্বর-৭/১ সহ মোট ১৮টি বাড়ির কথা উল্লেখ ছিল। অভিযোগ ছিল, রাজউক কর্তৃক এই বাড়িগুলোর নিলাম দরপত্রে কারচুপি করা হয় এবং সাজানো দরপত্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু পছন্দের ব্যক্তিকে বাড়িগুলো পাইয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে সরকার ১২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১৯ হাজার ৫৯ টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী তার ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ‘দ্য বাংলাদেশ অ্যাবানডন্ড প্রপার্টি (কন্ট্রোল, ম্যানেজমেন্ট ও ডিসপোজাল) অর্ডার, ১৯৭২’ এর নিয়মাবলী উপেক্ষা করেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাড়িগুলো বিক্রির ব্যবস্থা না করে, বরং প্রভাবশালীদের লাভবান করার উদ্দেশ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের উচ্চমূল্যের দরপত্রগুলোকে আমলে নেওয়া হয়নি। পরিবর্তে রাজউকের মাধ্যমে সাজানো নিম্নমূল্যের দরপত্র অনুমোদন করা হয়।
এই কর্মকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে মির্জা আব্বাসসহ অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারার অধীনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আদালত মোট ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সবশেষে সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তির পর্যালোচনার পর আদালত আসামিদের খালাস প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন।
















