বরিশল শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত এক বিশাল সাংগঠনিক সভায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের অভ্যন্তরে একতা ও সংহতি বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিগত ১৭ বছরের দীর্ঘ লড়াইয়ে আপনারা যেভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন, আগামীতেও ঠিক সেভাবেই সংহতি ধরে রাখতে হবে। তিনি স্বীকার করেন যে, দলের ভেতরে মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে সেই মতপার্থক্য যেন কখনোই সামগ্রিক ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। তারেক রহমান সতর্ক করে বলেন, ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তি বা গুপ্তচরের পক্ষে দলের ভেতর প্রবেশ করা কিংবা সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু ঐক্যে সামান্য ফাটল ধরলেই ষড়যন্ত্রকারীরা সেই সুযোগটি লুফে নেবে।

বিগত ১৭ বছরের দুঃসহ স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দলীয় প্রধান। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘আপনারা গত ১৭ বছর ধরে অদম্য সাহসের সাথে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। গুম, খুন এবং অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েও আপনারা দমে যাননি, বরং সবাই মিলে দল সামলিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে আপনারা নিজের পরিবারের চেয়ে দলের জন্য বেশি সময় দিয়েছেন, নিজেদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনের টেনশন আর যন্ত্রণা আপনারা দলের জন্য যেমন সহ্য করেছেন, নিজের পরিবারের জন্য কি তেমন সুযোগ পেয়েছিলেন? না। এভাবে দেশের প্রতিটি প্রান্তের বিএনপি নেতাকর্মী চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, এখন আর সেই নির্যাতনের ভয় নেই, তাই এখন ঐক্যবদ্ধ থাকা আরও বেশি জরুরি। অতীতে সবাই সবার পাশে দাঁড়িয়ে দল চালিয়েছেন, এখন কেন তা সম্ভব হবে না?

সভায় হাইব্রিড ও গুপ্তচরের বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা প্রদান করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে নির্বাচন আয়োজন নিয়ে অনেক ধরনের ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং সেই ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি একটি বিশেষ গ্রুপ দেশের বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দলকে আরও সুসংগঠিত করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, দল গোছানোর প্রক্রিয়ায় ‘হাইব্রিড’ ও ‘গুপ্ত’—এই দুটি বিষয়ের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তারা যেন কোনোভাবেই দলের নেতৃত্বের স্তরে প্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূলের ত্যাগের বিনিময়েই বিএনপি সরকার গঠন করেছে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আপনারা কি চান আপনাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক?’ উত্তরটি ইতিবাচক হলে তৃণমূল পর্যায়ে সর্বোচ্চ ঐক্য ও শক্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলীয় প্রস্তুতি পর্যালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, এই নির্বাচনের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন করেন, সেই প্রস্তুতি কি বর্তমানে আছে? উত্তরটি নেতিবাচক হলে তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া জয়লাভ করা সম্ভব নয়, আর জয়লাভ করতে না পারলে সরকার কীভাবে সচল থাকবে? তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিএনপি অবশ্যই লড়বে। বর্ষার পর বিস্তারিত আলোচনা করে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর আগে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কে চেয়ারম্যান হবেন, কে সদস্য হবেন এবং কে দল পরিচালনা করবেন—তা আপনারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। বিএনপি সবাইকে সাথে নিয়ে সামনে এগোতে চায়।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, সামনে হিন্দুদের একটি বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান রয়েছে। তিনি উপস্থিত নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন যেন এই উৎসবটি যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণভাবে সফল করা হয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, কেউ যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে সুযোগ নিতে না পারে। যারা সভায় উপস্থিত আছেন, তারা যেন অন্যদেরও এই বার্তা পৌঁছে দেন যাতে ধর্মীয় উৎসবের পরিবেশ বিঘ্নিত না হয় এবং কোনো অপশক্তি যেন এই সুযোগে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে বিগত ১৭ বছরের শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। দুর্নীতি, অনিয়ম এবং উন্নয়নের নামে লুটপাটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছরে আমরা কেবল উন্নয়নের কথা শুনতাম। কিন্তু সেই উন্নয়নের প্রকৃত রূপ কোথায়? আসলে উন্নয়ন হয়েছে তাদের নিজেদের পকেটে। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই তথাকথিত উন্নয়নগুলো বাস্তবে কোনো কাজেই আসছে না, বরং সব খাতের চরম বিপর্যয় ঘটেছে।’ উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ তোলেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ৫৪ হাজার কোটি টাকা, অথচ প্রায় সমমানের ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক ব্যয় হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রকাশিত শ্বেতপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, গত ১৭ বছরে প্রতি বছর গড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

উন্নয়নের সংজ্ঞাকে চ্যালেঞ্জ করে তারেক রহমান প্রশ্ন করেন, ‘উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা?’ তিনি বলেন, ঢাকা শহরে বড় বড় ফ্লাইওভার নির্মিত হলেও ড্রেন ও খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, উন্নয়ন হবে এবং বিএনপি তা করবে, তবে সেই উন্নয়ন হবে টেকসই ও জনকল্যাণমুখী। তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ ইতোমধ্যে হাতে নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন এবং খালেদা জিয়ার সরকার সেগুলোকে ৫১ শয্যায় উন্নীত করেছিল; এখন বিএনপি সেগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করবে। বিশেষ করে শিশুদের চিকিৎসার কষ্ট লাঘব করতে সারা দেশে এক হাজারটি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন তিনি। তার মতে, প্রকৃত উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নয়, বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু চিকিৎসা এবং পরিবেশ রক্ষা—সবকিছুর সমন্বয়।

দেশের চরম সংকটকালীন মুহূর্তে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও বেশ কিছু জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত এবং চিকিৎসা খাতকে পরিকল্পিতভাবে নাজুক করে দেওয়া হয়েছে। মহানগর ও জেলা পর্যায়ে সীমিত স্বাস্থ্যসেবা মিললেও উপজেলা পর্যায়ের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। শিক্ষা ব্যবস্থাকেও এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে, দেশের শিক্ষার্থীদের সনদের আন্তর্জাতিক মূল্য নেই এবং শিক্ষিতরাই আজ সবচেয়ে বেশি বেকার। এই সব বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে তিনি জবাবদিহির অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট সময় পর নির্বাচন হওয়া এবং জনগণের ভোটে শাসক নির্বাচিত হওয়া হলো জবাবদিহির একমাত্র পথ, যা গত ১৭ বছরে ধ্বংস করা হয়েছে।

ধ্বংসপ্রাপ্ত এই অবস্থায় দায়িত্ব নিয়ে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ডের কাজ শুরু হয়েছে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে রমজান শুরু হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যার ফলে মানুষ তুলনামূলক স্বস্তিতে রমজান কাটিয়েছে। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় সরকারকে অতিরিক্ত আড়াই বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

সবশেষে একটি উদাহরণের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের দায়িত্ববোধ মনে করিয়ে দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, একটি পরিবারে পাঁচজন সদস্য থাকলে এবং একজনের দায়িত্ব হলে ঘর গুছিয়ে রাখা, কিন্তু বাকি চারজন যদি ঘর নোংরা করে, তবে সেই একজনের পক্ষে পুরো ঘর পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। সবাই মিলে পরিষ্কার রাখলে ময়লা কম হবে। একইভাবে দেশকেও একটি পরিবারের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, এখন আপনারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাই আপনাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং বুঝেশুনে কাজ করতে হবে।