রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চার সদস্যের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ছিল ইয়াবার নেশা এবং পরিচয় গোপন করার মরিয়া চেষ্টা। গ্রেপ্তার আসামি সিদ্ধার্থ দাস আদালতের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই লোমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে রংপুর মহানগর পুলিশ (আরপিএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মামলার তদন্তের অগ্রগতি এবং আসামির জবানবন্দির চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো তুলে ধরেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ দাস জানান, গত ২১ আগস্ট শুক্রবার ভোরের আগে তিনি এবং তার সহযোগী মুগ্ধ দাস বেশ কিছু ইয়াবা সেবন করেছিলেন। রাত ১২টার পর সীমান্তের একটি বাসায় তিনটি ইয়াবা সেবনের পর, রাত ৩টার দিকে তারা কামাল কাছনার ইয়াবা কারবারি শান্তর কাছ থেকে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। নেশার ঘোরে রাস্তায় কুকুরের তাড়া খেয়ে তারা দেবুদের বাড়ির প্রাচীর ও ছাদ টপকে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে তারা ইয়াবা সেবন করতে থাকেন। সিদ্ধার্থের দাবি, ওই রাতে তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেছিলেন, যা তাদের স্বাভাবিক সহনক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। ইয়াবার তীব্র প্রভাবে তারা সময়ের জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন এবং কখন ভোর হয়েছে তা বুঝতে পারেননি।

জবানবন্দি অনুযায়ী, ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে এসে তাদের দেখতে পান। তিনি তাদের সেখানে উপস্থিতির কারণ জানতে চেয়ে ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ পরিচয় প্রকাশ হয়ে গেলে সামাজিক মান-সম্মান নষ্ট হবে এবং আইনি জটিলতায় পড়তে হবে—এই ভয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতির গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর মরদেহটি ছাদের এক পাশে টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।

ঘটনার শব্দ শুনে গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে যখন ছাদে আসেন, তখন খুনি দুজন তাদের ওপরও হামলা করেন। জবানবন্দিতে সিদ্ধার্থ জানান, মুগ্ধ গামছা দিয়ে গণপতির স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন এবং তিনি এক হাতে মেয়ের গলা ও অন্য হাতে মুখ চেপে ধরেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর গামছা এবং কবুতরের ঘরের বাক্স থেকে নেওয়া রশি দিয়ে মেয়েটিকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।

এরপর তারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পান, গণপতির ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠে গেছেন। সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম তাকে চিনতে পারেন এবং প্রশ্ন করেন, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত আশঙ্কায় তারা প্রিয়মকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যার পর নিজেদের উপস্থিতির প্রমাণ মুছে ফেলতে তারা সিসিটিভি ক্যামেরা অচল করার চেষ্টা করেন। এজন্য প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের তার কেটে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির রূপ দিতে ঘরের ড্রয়ার খুলে আসবাবপত্র এলোমেলো করে রাখা হয়। এরপর তারা স্বর্ণালংকার এবং নগদ ১৫ হাজার টাকা লুট করে সেখান থেকে পালিয়ে যান। সিদ্ধার্থ আরও জানান, পালানোর আগে তারা গোসল করেন এবং আরও একটি ইয়াবা সেবন করে দেয়াল টপকে চলে যান। লুট করা টাকা থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নিয়ে তিনি বন্ধক রাখা নিজের মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ জানান, অপর আসামি মুগ্ধ দাসও আদালতে একই ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। নিহতদের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে শ্বাসরোধে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে, তবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বর্তমানে আসামিদের ডোপ টেস্ট এবং ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। সংবাদ সম্মেলনে জবানবন্দির তথ্য তুলে ধরার পর সাংবাদিকেরা মামলার বিভিন্ন বিষয়ে পুলিশ কমিশনারকে প্রশ্ন করেন। তবে তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দ্রুত সংবাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন।