পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনাসহ গণহত্যার দায়ে অভিযুক্তদের আশ্রয় দিয়ে ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে বলে গুরুতর অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও প্রজন্ম দলের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন। মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ পৃথক পৃথক বক্তব্য প্রদান করেন।

বক্তব্যের শুরুতেই রুহুল কবির রিজভী ভারতের দ্বিমুখী আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ভারত মুখে বন্ধুত্বের কথা বললেও তাদের বাস্তব কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ১৪০০ তরুণ-কিশোর, ছাত্র-জনতা ও শ্রমিকের রক্তে হাত রাঙানো শেখ হাসিনাসহ গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর গুলি চালানো সহযোগীরা বর্তমানে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকার আদালতের পরোয়ানা অনুযায়ী তাদের বারবার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানালেও ভারত তা আমলে নিচ্ছে না, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। অতীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত এক সাবেক মেজরকে গ্রেপ্তার করে শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তরের দৃষ্টান্ত টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ১ হাজার ৪০০ মানুষ হত্যার দায়ে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে ভারত কেন হস্তান্তর করছে না? এই রহস্যময় নীরবতার পেছনে ভারতের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেন রিজভী। তিনি বলেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসে সরকারপ্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ না জানিয়ে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে সাইডলাইনে বসার মতো করে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক চরম অপমান। প্রধানমন্ত্রী সেই অপমানজনক আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে প্রমাণ করেছেন যে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা কোনো কিছুর কাছেই গৌণ নয়। তাঁর এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং জাতীয় সম্মানের প্রতীক।

প্রধানমন্ত্রী ব্রিকসে যাবেন না বলে ঘোষণা দেওয়ার ঠিক পরের দিনই আদানি পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের এক ‘নাটক’ সাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব। তিনি বলেন, ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত ওই পাওয়ার প্লান্টের নিয়ন্ত্রণ ভারতের হাতে থাকায় তারা যখন ইচ্ছা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ বা চালু করতে পারে। এই কূটকৌশল ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা বোঝার জন্য সাধারণ মানুষের সাধারণ জ্ঞানই যথেষ্ট।

বিগত ১৬ বছরের লুণ্ঠন, ব্যাংক লুট, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লব এবং আগামী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায়ে গঠিত বর্তমান সরকার দেশে আইনের শাসন ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে পার্লামেন্টের ভেতরে বা বাইরে বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা বা কঠোর ভাষায় কথা বললেও কেউ গুম বা হত্যার শিকার হচ্ছেন না। দেশে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল অঙ্গীকার।

দেশের বর্তমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, এটি সরকারের কোনো অব্যবস্থাপনার ফল নয়, বরং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে সৃষ্ট এক বৈশ্বিক সংকট। তবে সরকার এই সংকট মোকাবিলায় সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে। বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির মাধ্যমে শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালির সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলের তুলনায় আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

সবশেষে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ডাকসু সংলগ্ন ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিন নিয়ে সাম্প্রতিক অপতৎপরতার তীব্র নিন্দা জানান রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, মধুর ক্যান্টিনকে ‘ইশরাত মঞ্জিল’ বানানোর চেষ্টা করা শহীদ মধুর আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা। একাত্তরের পরাজিত শক্তি যদি ভিন্ন কৌশলে প্রতিশোধ নিতে চায়, তবে এ দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা ও মুক্তিযোদ্ধারা তা কোনোভাবেই সফল হতে দেবেন না। একাত্তরের অর্জনকে মুছে ফেলার যেকোনো অপচেষ্টাকে কঠোর হাতে প্রতিহত করা হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।