জয়পুরহাটের পাঠানপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ: ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার পাঠানপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও চরম দায়িত্বহীনতার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি তাকে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ প্রদান করেছে। অভিযুক্ত শিক্ষককে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের বিষয়ে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সূত্র অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট পরিচালনা কমিটির সভাপতি আরিফুল ইসলামের স্বাক্ষরে এই নোটিশটি জারি করা হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনার জন্য গঠিত তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি ব্যাপক ধরনের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের তথ্য খুঁজে পেয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বিদ্যালয়ের মোট ছয়টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যে পাঁচটি অ্যাকাউন্টের কোনো ধরনের নথিপত্র বা হিসাব সংক্রান্ত তথ্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তদন্ত কমিটির কাছে দাখিল করেননি। এছাড়া পরিচালনা কমিটি কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পূর্বানুমতি ছাড়াই বিভিন্ন বিল ও ভাউচার তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, যা সরাসরি অর্থ আত্মসাতের শামিল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে প্রশাসনিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিভিন্ন চিত্র। জানা গেছে, সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল কুদ্দুসের বিএড সনদ জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে অবৈধভাবে দুইবার নিয়োগ প্রদানে সহায়তা করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। এমনকি পরবর্তী তদন্ত প্রক্রিয়া এবং আদালতে সাক্ষ্য প্রদান থেকেও তিনি নিজেকে বিরত রেখেছেন। এ ছাড়া শিক্ষকদের টাইম স্কেলের নথিতে জালিয়াতি করা, প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ ইচ্ছাকৃতভাবে শূন্য রাখা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষকদের ছুটি মঞ্জুর করার মতো গুরুতর অভিযোগও আনা হয়েছে।
পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবহেলার পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আরও কিছু আচরণগত অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সঙ্গীতের সময় অনুপস্থিত থাকা, বিদ্যালয়ে খাট-বালিশ রেখে বিশ্রামের ঘর তৈরি করা এবং বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে বাজারে আড্ডা দেওয়া। এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মোট ১৪টি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরিচালনা কমিটির সভাপতি আরিফুল ইসলাম বলেন, "প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং আর্থিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতেই আমরা এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। নির্ধারিত ১০ কর্মদিবসের মধ্যে যদি কোনো সন্তোষজনক জবাব না পাওয়া যায়, তবে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আতাউর রহমান বলেন, "অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং সত্য নয়। একটি কুচক্রী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এসব কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। আমি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে আমার লিখিত জবাব দাখিল করবো।"
বিষয়টি সম্পর্কে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অ্যাকাডেমিক সুপারভাইজার বাবলু কুমার মন্ডল জানান, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং জবাব পাওয়ার পর যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে মাউশির (MAUSI) বিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে।
অন্যদিকে, ক্ষেতলাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি বা প্রশাসনিক ব্যত্যয় ঘটলে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। পরিচালনা কমিটির প্রতিবেদন ও অভিযুক্তের লিখিত জবাব পর্যালোচনার পর প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পরিচালনা কমিটি আরও জানিয়েছে, জবাব সন্তোষজনক না হলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী চাকরি (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




















