নির্বাচন কমিশন (ইসি) নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা-২০০৮ সংশোধন করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এই সংশোধনের ফলে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। নতুন নিয়মের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বর্তমানে ‘নৌকা’ প্রতীকটি স্থগিত রাখা হয়েছে এবং সাধারণ প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য মোট ১২০টি প্রতীক সংরক্ষিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, যেসব আসনে একক প্রার্থী নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে ভোটারদের মতপ্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে ‘না’ প্রতীক ব্যবহারের বিশেষ বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে এই প্রজ্ঞাপনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রিপ্রেজেন্টেশন অব দ্য পিপল অর্ডার, ১৯৭২ (প্রেসিডেন্টস অর্ডার নম্বর ১৫৫ অব ১৯৭২)-এর ৯৪ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন এই বিধিমালা সংশোধন করেছে। মূলত বিধি-৯ এর উপ-বিধি (১)-কে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর করা হয়েছে।
নতুন বিধি অনুযায়ী, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অনুচ্ছেদ ২০-এর দফা (১)-এর অধীনে স্থগিতকৃত প্রতীক বাদে নির্ধারিত তালিকা থেকে প্রাপ্যতা সাপেক্ষে যেকোনো একটি প্রতীক বরাদ্দ করা যাবে। সংরক্ষিত এই ১২০টি প্রতীকের বিস্তারিত তালিকায় রয়েছে— আনারস, আপেল, আম, আলমিরা, ঈগল, উট, গরুর গাড়ি, গাভী, গামছা, গোলাপ ফুল, ঘণ্টা, ঘুড়ি, ট্রাক, ট্রাক্টর, ডাব, ড্রেসিং টেবিল, ঢেঁকি, তারা, ফুলের মালা, বই, বক, বটগাছ, সাইকেল, বাঘ, রকেট, রিকশা, রেল ইঞ্জিন, লাঙল, লিচু, শাপলা কলি, উদীয়মান সূর্য, একতারা, কবুতর, কম্পিউটার, কলম, কলস, কলার ছড়ি, কাঁচি, কাঁঠাল, কাপ-পিরিচ, কাস্তে, কুঁড়ে ঘর, কুড়াল, কুমির, কুলা, কেটলি, কোদাল, খেজুর গাছ, ঘোড়া, চশমা, চাকা, চাবি, চিংড়ি, চিরুনি, চেয়ার, ছড়ি, ছাতা এবং জগ।
তালিকায় আরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে— জাহাজ, টর্চ লাইট, টিউবওয়েল, টেবিল, টেবিল ঘড়ি, টেবিল ল্যাম্প, টেলিফোন, টেলিভিশন, তালা, থালা, দাঁড়িপাল্লা, দালান, দেওয়াল ঘড়ি, দোতলা বাস, দোয়াত কলম, দোলনা, ধানের শীষ, নোঙ্গর, নৌকা (যা বর্তমানে স্থগিত), পাগড়ি, পানির ট্যাপ, পালকি, প্রজাপতি, ফুলের ঝুড়ি, ফুটবল, ফুলকপি, বালতি, বেবি টেক্সি, বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব, মই, মগ, ময়ূর, মশাল, মাইক, মাছ, মাথাল, মিনার, মোটরগাড়ি (কার), মোটরসাইকেল, মোড়া, মোবাইল ফোন, মোমবাতি, মোরগ, সিংহ, সিঁড়ি, সূর্যমুখী ফুল, সেলাই মেশিন, সোনালী আঁশ, সোফা, হরিণ, হাঁস, হাত (পাঞ্জা), হাতঘড়ি, হাতপাখা, হাতি, হাতুড়ি, হারিকেন, হুক্কা, হেলিকপ্টার, হ্যান্ডশেক এবং বিশেষ ‘না’ প্রতীক।
প্রতীক পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রজ্ঞাপনে প্রশাসনিক ও হলফনামা সংক্রান্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন আনা হয়েছে। তফসিল-১ এর ফরম-১ এর তৃতীয় অংশে, যেখানে মনোনীত প্রার্থীর ঘোষণা থাকে, সেখানে নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরের পাশাপাশি প্রার্থী অথবা প্রার্থীর নিয়োজিত নির্বাচনী এজেন্টের অ্যাকাউন্ট নম্বর উল্লেখ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া, প্রার্থী কর্তৃক প্রদত্ত হলফনামার সংযুক্তি-১ এর ক্রমিক নম্বর ৩ (খ)-তে আগে ‘সংযুক্ত করিতে হইবে’ কথাটি ছিল, যা এখন পরিবর্তন করে ‘দাখিল ঐচ্ছিক মর্মে বিবেচিত হইবে’ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট কিছু তথ্যের সংযুক্তি এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। একইসাথে সংযুক্তি-১ এর ক্রমিক নম্বর ৩ (গ)-তে একটি নতুন বিশেষ দ্রষ্টব্য যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ‘অভিযুক্ত’ বলতে কেবল সেই আসামিকে বোঝানো হবে, যার বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়েছে।
অবশেষে, হলফনামার ক্রমিক নম্বর ১০-এ আরও একটি বিশেষ দ্রষ্টব্য সন্নিবেশিত করা হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছে যে, প্রার্থীর স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং নির্ভরশীল ব্যক্তিদের আয়কর সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা এখন থেকে ঐচ্ছিক। অর্থাৎ, এই তথ্যগুলো প্রদান না করলেও তা আর বিধি বহির্ভূত হিসেবে গণ্য হবে না। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জটিলতা কমাতে এবং প্রার্থীরা যাতে আরও সহজে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।


















