শরীয়তপুরের নড়িয়ায় শ্রী শ্রী সত্যনারায়ণের সেবামন্দিরের প্রায় চারশ বছরের প্রাচীন এক ঐতিহ্যবাহী দ্বিতল ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মন্দির পরিচালনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত এবং অধিকাংশ সদস্যকে অন্ধকারে রেখে এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কমিটির সংশ্লিষ্ট সদস্যরা। এই আকস্মিক ঘটনার পর ভক্ত এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সেবামন্দিরের নাটমন্দির, লক্ষ্মণ ঘর এবং মোহন্তদের ব্যবহৃত বিশ্রামঘর ভাঙার পাশাপাশি রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত সেই ঐতিহাসিক ভবনটিও সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হয়। নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক এলাকায় প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত সাধক শ্রী শ্রী রামঠাকুরের জন্মভূমিতে এই সেবামন্দিরটি অবস্থিত। প্রবীণদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, দুর্গামন্দিরের পাশে থাকা এই ঐতিহ্যবাহী ভবনের চিলেকোঠায় বসেই রামঠাকুর তাঁর পূজা ও ধ্যান সম্পাদন করতেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস হামলায় ঠাকুরঘরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, ভবনটি দীর্ঘকাল ধরে রামঠাকুরের শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে ছিল, যা ভক্তদের কাছে ছিল এক পবিত্র তীর্থস্থানের মতো।

রামঠাকুরের আত্মীয় এবং স্থানীয় বাসিন্দা শিল্পী রানী চক্রবর্তী অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান, এটি ছিল মূলত ঠাকুরের দাদার বাড়ি। রামঠাকুর যখন এখানে আসতেন, তখন ভবনের চিলেকোঠায় ধ্যান করতেন বলে স্থানটি ‘ধ্যানঘর’ নামে পরিচিত ছিল। দেশ-বিদেশ থেকে আসা অসংখ্য ভক্ত এই ঐতিহাসিক ভবনটি দর্শনে আসতেন এবং অনেকে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এর পবিত্র মাটিও সাথে নিয়ে যেতেন। তাই ভবনটি সংরক্ষণ ও সংস্কারের দাবি দীর্ঘকাল ধরে উঠছিল এবং অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী এর জন্য অনুদান দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তা সত্ত্বেও কাউকে না জানিয়ে রহস্যজনকভাবে ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের শরীয়তপুর জেলা আহ্বায়ক বিজন চন্দ্র মজুমদার বলেন, এটি কেবল একটি দালান ছিল না, বরং রামঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত এক গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি ছিল। যথাযথ সংরক্ষণ করা উচিত ছিল এই স্থাপনাটির। ভারপ্রাপ্ত মোহন্তকে অবগত না করেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অন acceptable। মন্দির পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ বলরাম দাস জানান, ভবনটি ভাঙার বিষয়ে তাকেও কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি এবং কমিটির অধিকাংশ সদস্যই এই সিদ্ধান্তের কথা জানতেন না। তাঁর মতে, পরিচালনা কমিটির সম্মিলিত সিদ্ধান্তে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা সবার জানা থাকত। কমিটির সদস্য ত্রিনাথ ঘোষ অভিযোগ করেন, অন্যান্য সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক একক সিদ্ধান্তে ভবনটি ভেঙে ফেলেছেন। ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত দেশে ফিরলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুকুল চন্দ্র রায়। তিনি দাবি করেন, ভবনটি দীর্ঘকাল ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। চুন-সুরকির পুরোনো গাঁথুনির কারণে এটি আর সংস্কারের উপযোগী ছিল না। তাই ভবিষ্যতে এখানে নতুন ও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা থেকেই ভবনটি অপসারণ করা হয়েছে। সহসভাপতি বিশ্বনাথ চক্রবর্তী বলেন, ভবনটি গাছপালা ও জঞ্জালে পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল, যা পরিবেশ ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি ছিল। উন্নয়নকাজের স্বার্থেই এটি অপসারণ করা হয়েছে। তবে মোহন্তকে জানানো হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কৌশলে বলেন, ‘সেটা তাঁকেই প্রশ্ন করুন।’

বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন সেবামন্দিরের ভারপ্রাপ্ত মোহন্ত ও যুবরাজ শ্রীমৎ সুভাষ চক্রবর্তী। তিনি মোবাইল ফোনে আলাপকালে জানান, ঐতিহ্যবাহী ভবনটি ভাঙার বিষয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা বা পরামর্শ করা হয়নি। তিনি পূজার আগে দেশে ফিরে পরিচালনা কমিটির সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করবেন এবং পরবর্তী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন।

এই পুরো ঘটনায় শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, প্রশাসন সব সময়ই পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের পক্ষে। ভবনটি কেন ভাঙা হয়েছে এবং এই বিষয়ে কোনো পূর্ব সিদ্ধান্ত বা প্রস্তাব ছিল কি না, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। এ বিষয়ে যথাযথ অভিযোগ পেলে প্রশাসন বিষয়টি খতিয়ে দেখবে।