সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার, ব্যাপক নিয়োগ-বাণিজ্য, টেন্ডার সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে বিস্তারিত অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দুদকের একটি অভ্যন্তরীণ নথি থেকে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের যে অভিযোগগুলো জমা পড়েছে, তা খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যবহার করে আসিফ মাহমুদ পর্তুগালে জমি কিনেছেন এবং দুবাইয়ের গ্রিন গ্রুপে বড় অংকের বিনিয়োগ করেছেন। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। এই পাচারকৃত অর্থ দিয়ে বিদেশে বিলাসবহুল ভিলা ক্রয় এবং বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শুধু তিনি একাই নন, তার দুই ভগ্নিপতি এবং এক ভাগ্নের মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করে পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও গাড়ি ব্যবহার এবং হেলিকপ্টারে ভ্রমণের মাধ্যমে অতি-বিলাসী জীবনযাপনের অভিযোগও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়োগ-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও অভিযোগের তালিকা বেশ দীর্ঘ ও গুরুতর। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের বিনিময়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের জন্য ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের বিনিময়ে মোটা অংকের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে আব্দুস সালামের নিয়োগে ১০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানের নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে আব্দুল লতিফ খানের নিয়োগের বিনিময়ে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও কোটি কোটি টাকার লেনদেনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অনিয়মের অভিযোগও অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ করা হয়েছে যে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার-বাণিজ্যের সঙ্গেও তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
স্বজন ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন এবং এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন। এছাড়া তার পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের জন্য তদবির করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
দুদক জানিয়েছে, জমা দেওয়া অভিযোগগুলোর গুরুত্ব এবং প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতেই আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে এই অনুসন্ধান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।


















