রাজনীতির মূল ধারায় প্রথাগতভাবে সরাসরি সক্রিয় না থাকলেও, সম্প্রতি দেশজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন বিএনপির সাবেক মহাসচিব এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জ্যেষ্ঠ কন্যা, প্রথিতযশা চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক ডা. শামারুহ মির্জা। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ফলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া শূন্য আসন ‘ঠাকুরগাঁও-১’-এর আসন্ন উপনির্বাচন এখন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ডা. শামারুহ মির্জার নামই বর্তমানে সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং এই নির্বাচনী এলাকার শক্তিশালী দুর্গ অক্ষুণ্ণ রাখতে ধানের শীষ নিয়ে ভোটের মাঠে নামার দৌড়ে ডা. শামারুহ মির্জা বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি বরাবরই বিএনপির একটি অপরাজেয় দুর্গ হিসেবে পরিচিত। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং দলীয় প্রভাব এই আসনের ফলাফল নির্ধারণে বরাবরই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। এখন তার অনুপস্থিতিতে সেই বিশাল ভোটব্যাংক ধরে রাখা এবং বিএনপির ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা যেকোনো নতুন প্রার্থীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর ঠিক এই জায়গাতেই দলটির হাইকমান্ডের ভেতরে ও বাইরে ডা. শামারুহ মির্জার নাম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর মতে, ডা. শামারুহ মির্জা কেবল উচ্চশিক্ষিত গবেষক হিসেবেই নয়, বরং একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য। বিশেষ করে করোনাকালে এবং বিভিন্ন জাতীয় সংকটের সময়ে ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দুস্থ ও অসচ্ছল পরিবারের পাশে তিনি চিকিৎসাসেবা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এছাড়া নারী ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ স্থানীয় তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটারদের মধ্যে এক গভীর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির এক সিনিয়র নেতা জানান, আধুনিক ও উচ্চশিক্ষিত নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে ডা. শামারুহ মির্জাকে প্রার্থী করা হলে তা কেবল স্থানীয় বিএনপিতে নতুন গতিই আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দলের একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ও শিক্ষিত ভাবমূর্তিও তৈরি করবে, যা বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।
তবে এই উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ উত্তাপ বিরাজ করছে। ডা. শামারুহ মির্জার পাশাপাশি এই দৌড়ে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছেন মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই এবং ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও পৌরসভার সাবেক সফল মেয়র মির্জা ফয়সাল আমিন। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে নিবিড় সম্পর্কের কারণে তৃণমূলের একটি বড় অংশ তাকেও যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখতে চায়। এছাড়া জেলা বিএনপির দুই সহসভাপতি ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও সুলতানুল ফেরদৌস নম্র চৌধুরীর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
এদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের পরিস্থিতিও বেশ চ্যালেঞ্জিং। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রায় ৯৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিশাল জয় পেয়েছিলেন। তবে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন ১ লাখ ৪১ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামী এই আসনে পুনরায় দেলাওয়ার হোসেনকেই প্রার্থী করার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে এই আসনে লড়াইয়ের যে তীব্র সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে বিএনপিকেও একজন হাই-ভোল্টেজ ও প্রভাবশালী প্রার্থী দিতে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
উপনির্বাচন নিয়ে দলের ভেতর কোনো ধরনের গ্রুপিং বা বিভাজনের সুযোগ নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেন্দ্রীয় হাইকমান্ড এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবেন, দলীয় সকল ভেদাভেদ ভুলে তৃণমূলের প্রতিটি কর্মী-নেতা তার পক্ষেই একযোগে কাজ করবেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য জানিয়েছেন, খুব শীঘ্রই নির্বাচন কমিশন এই আসনের উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে। তফসিল ঘোষণার পরপরই স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও মতবিনিময় করে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। এখন দেখার বিষয়, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কাকে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে।



















