সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং তাঁর প্রকাশ্যে না আসার কারণ নিয়ে বিশেষ মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। সম্প্রতি ‘ঠিকানায় খালেদ মুহিউদ্দীন’ নামক এক টকশোতে আলাপচারিতার সময় তিনি এই মত প্রকাশ করেন। ভারতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং তাঁর সশরীরে সামনে না আসার প্রসঙ্গটি যখন উত্থাপিত হয়, তখন ড. আসিফ নজরুল তাঁর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
টকশোতে উপস্থাপকের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, শেখ হাসিনা কেন অডিও বার্তার মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছেন, কেন ভিডিওতে কথা বলছেন না বা কেন সশরীরে উপস্থিত হচ্ছেন না। এই প্রশ্নের জবাবে ড. আসিফ নজরুল বলেন, তাঁর ধারণা শেখ হাসিনা হয়তো বর্তমানে অসুস্থ। তিনি মনে করেন, এই অসুস্থতার বিষয়টি যদি প্রকাশ্যে আসে, তবে তাঁর অনুসারী ও সমর্থকদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে বা তারা ডিমোরালাইজড হয়ে পড়তে পারেন। এই বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া তাঁর প্রকাশ্যে না আসার অন্য কোনো কারণ ড. আসিফ নজরুল খুঁজে পাননি। একইসাথে, শেখ হাসিনাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, তাঁকে বন্দি করার কোনো বিষয় নেই।
আলোচনার এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিষয়েও আলোকপাত করেন ড. আসিফ নজরুল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সেই সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা ছিল এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারত। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ও পর্যালোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকারের মনে হয়েছিল, বড় ধরনের কোনো ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষের স্বস্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থেই সাময়িকভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
তবে টকশোর সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি তৈরি হয় যখন উপস্থাপক খালেদ মুহিউদ্দীন ড. আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনের একটি অপ্রীতিকর ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তৎকালীন ছাত্রনেতারা ড. আসিফ নজরুলের প্রতি এতটাই অসন্তুষ্ট ছিলেন যে, প্রতিবাদস্বরূপ তাঁর মেয়ের একটি পোষা ছাগল নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলেছিলেন। এমনকি তারা প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে, ড. আসিফ নজরুল বিএনপির লোক হওয়ার কারণে তাঁর প্রতি এই শত্রুতা পোষণ করা হয়েছে এবং এটি একটি প্রতিশোধমূলক কাজ ছিল।
এই প্রশ্নের জবাবে ড. আসিফ নজরুল অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, কারা এই কথা বলেছে তিনি তা জানেন না। তবে তিনি জানান, ছাত্র অধিকার পরিষদের নাহিদ, আসিফ ও আখতারের মতো নেতাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত অন্তরঙ্গ ছিল। কিন্তু বাইরে থেকে আসা কিছু শিক্ষার্থীর সাথে তাঁর যোগাযোগ কম থাকায় হয়তো কিছু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেই বিষয়গুলোকে তিনি কখনোই গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি।
পোষা ছাগলটি চুরি হওয়া এবং তা খেয়ে ফেলার ঘটনাটি বর্ণনা করতে গিয়ে ড. আসিফ নজরুল আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এটি তাঁর জীবনের অন্যতম হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। যদি কেউ মনে করে যে এটি রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে করা হয়েছে, তবে সেই ব্যক্তির মানসিকতা অত্যন্ত অমানবিক এবং পিশাচতুল্য। তিনি মনে করেন, পুরো ঘটনাটি কেবল নিছক মজা করার জন্য করা হয়েছিল, যা অত্যন্ত নির্মম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক জানান, ওই ছাগলটি ছিল তাঁর সাড়ে নয় বছর বয়সী মেয়ের অত্যন্ত প্রিয় একটি পোষা প্রাণী। ফুলার রোড থেকে হেয়ার রোডে চলে আসার পর তাঁর মেয়ের তেমন কোনো বন্ধু ছিল না, যার ফলে সে প্রচণ্ড ট্রমাটাইজড হয়ে পড়েছিল। সেই একাকীত্ব দূর করতে এবং মেয়ের মানসিক প্রশান্তির জন্য তাঁরা একটি ছাগল কিনে দিয়েছিলেন। মেয়েটির সাথে প্রাণীটির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। ড. আসিফ নজরুল জানান, তাঁর মেয়ে প্রতিদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত কখন সে স্কুল থেকে ফিরবে এবং ছাগলটির সাথে খেলবে। এমনকি মেয়েটি তার ফোনে মায়ের ছবির পাশাপাশি ওই ছাগলটিকে জড়িয়ে ধরে থাকা একটি ছবি রেখেছিল।
ঘটনার পর মেয়েটির মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ছাগলটি নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বমি করে দিচ্ছিল এবং প্রায় দেড় দিন ধরে কিছুই খেতে পারেনি। সে এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল যে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে তিনি জানান, তাঁর মেয়ে আজ পর্যন্ত জানে না যে তার প্রিয় ছাগলটিকে খেয়ে ফেলা হয়েছে। যদি সে এই সত্য জানতে পারে, তবে সে প্রচণ্ড ভেঙে পড়বে। তাই তাঁরা মেয়েটিকে বলেছেন যে, দরজা খোলা থাকায় ছাগলটি পালিয়ে গেছে। যারা এই কাজটি করেছে, তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে ড. আসিফ নজরুল বলেন, তাঁদের মতো ‘ইতর-পাষণ্ড পশু’ আর কেউ নেই।















