সংসারের চরম অভাব-অনটন এবং ঋণের চাপে দিশেহারা হয়ে নিজের একটি কিডনি বিক্রি করতে গিয়ে ভয়াবহ প্রতারণার শিকার হয়েছেন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার এক দিনমজুর। ভুক্তভোগীর নাম মন্টু মিয়া। ১০ লাখ টাকায় কিডনি বিক্রির চুক্তি হলেও অস্ত্রোপচারের পর তাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। এই প্রতারণার বিচার চেয়ে গত ১৩ জুন জয়পুরহাট আদালতে মামলার আবেদন করেন তিনি। উক্ত মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত আরও তিন-চারজনকে আসামি করা হয়েছে।

মন্টু মিয়ার নিয়োজিত আইনজীবী মো. উজ্জল হোসেন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মামলার এজাহারে আসামিদের তালিকায় রয়েছেন বগুড়ার সদর উপজেলার নিশিন্দারা (খাঁ পাড়া) গ্রামের সাব্বির আহমেদ এবং একই জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়ার সুমন আলী। এছাড়া জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, বহুতি গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জের ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জের তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী মন্টু মিয়া গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুকশিয়া গ্রামের আব্দুল কাফিরের ছেলে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, দিনমজুর মন্টু মিয়া দীর্ঘ দিন ধরে সংসার চালাতে গিয়ে প্রচুর ধার-দেনা করে ফেলেছিলেন। অভাবের তাড়নায় স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি ও বেসরকারি সংস্থার কাছে তার বড় অঙ্কের ঋণ ছিল। এই চরম অসহায় অবস্থার সুযোগ নেয় প্রতারক চক্র। তারা মন্টু মিয়াকে কিডনি বিক্রির পরামর্শ দেয় এবং প্রলোভন দেখায়। আসামিরা তাকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে, ঢাকার এক বিত্তবান নারীর কিডনির খুব প্রয়োজন এবং কিডনি দাতাকে বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হবে।

প্রতারক চক্রটি মন্টু মিয়াকে প্রথমে ঢাকায় নিয়ে যায় এবং সেখানে তার পাসপোর্ট তৈরি করে দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুর দিকে তাকে অগ্রিম হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এরপর কৌশলে তাকে ভারত হয়ে নেপালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মন্টু মিয়ার একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। কিন্তু অস্ত্রোপচার শেষ হওয়ার পর এবং চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তি অনুযায়ী বাকি সাড়ে ৯ লাখ টাকা তাকে না দিয়ে কৌশলে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।

দেশে ফিরে এসে যখন মন্টু মিয়া তার পাওনা টাকা দাবি করেন, তখন তাকে আর টাকা দেওয়া হয় না। শেষ পর্যন্ত দিশেহারা হয়ে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতের নির্দেশে মামলাটি কালাই থানায় এফআইআর (FIR) হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কালাই উপজেলা বিএনপির আহবায়ক ইব্রাহিম হোসেন সংবাদমাধ্যম কালবেলাকে জানান, কালাই এলাকায় কিডনি বিক্রির এই প্রতারক চক্রগুলো অত্যন্ত গোপনে কাজ করছে। তারা দরিদ্র পরিবারগুলোর অভাবের সুযোগ নিয়ে তাদের প্রভাবিত করছে এবং প্রলুব্ধ করছে। তিনি মনে করেন, কিডনি বিক্রির কুফল এবং এর আইনি নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এখন সময়ের দাবি। একইসাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আদালতের নির্দেশে মামলাটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। কালাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, মামলার আসামিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।