রাজধানীর মালিবাগের ফরচুন শপিং কমপ্লেক্সে ব্যবসায়ী মো. ইসমাইল হোসেন প্রধানিয়াকে পরিকল্পিতভাবে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। এই স্পর্শকাতর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য পুলিশ সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। রমনা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে আলাপকালে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, তদন্তে যদি পুলিশের কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতা বা কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত শুক্রবার দুপুরে ফরচুন শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেনকে লক্ষ্য করে একদল ব্যক্তি আক্রমণ করে। অভিযোগ উঠেছে, তাকে প্রচণ্ডভাবে টানাহেঁচড়া করার পর কৌশলে তার পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এর পরপরই রমনা থানা পুলিশ তাকে আটক করে এবং তল্লাশির সময় তার প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে ৯০ পিস ইয়াবা উদ্ধারের দাবি করে। এই মাদক উদ্ধারের প্রেক্ষিতে পুলিশ বাদী হয়ে ইসমাইলের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করেছে।
ইসমাইল হোসেন ফরচুন শপিং কমপ্লেক্সের দোকান ও ফ্ল্যাট মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার পরিবারের দাবি, মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে তাকে এই মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি ইসমাইল হোসেনকে ধরে টানাহেঁচড়া করছেন এবং এক পর্যায়ে তাদের একজন ইসমাইলের পকেটে একটি রহস্যময় প্যাকেট ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ওই সময়েই ঘটনাস্থলের আশপাশে কয়েকজন পুলিশ সদস্য অপেক্ষমাণ অবস্থায় ছিলেন বলে ফুটেজে দেখা যাচ্ছে। পরিবারের অভিযোগ, পকেটে প্যাকেটটি ঢুকিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই পুলিশ এসে তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ইসমাইলের মেয়ে ইমতিশা, যিনি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, পুরো বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, শুক্রবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি তার বাবার সাথে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বাসায় ফেরার পথে ফরচুন শপিং কমপ্লেক্সের নিচে নামার পরপরই মাস্ক পরা কয়েকজন ব্যক্তি তার বাবাকে ধরে টানাহেঁচড়া শুরু করেন। ইমতিশা তার বাবাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে তার বাবাকে সিঁড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয় এবং ধস্তাধস্তির সময় তার জামা খুলে যায়। সেই সুযোগে আক্রমণকারীদের একজন তার বাবার পকেটে কিছু একটা ঢুকিয়ে দেন। এরপরই পুলিশ এসে তার বাবাকে আটক করে নিয়ে যায় এবং থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ইসমাইলের বিরুদ্ধে এর আগে চাঁদাবাজি ও হুমকির অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার আদালতের আদেশে রমনা থানায় ওই মামলাটি করেন একই মার্কেটের ফ্ল্যাট মালিক জাবেদ রায়হান। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ জুলাই মার্কেটের সামনে প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া মাহফিল এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের সুস্থতার জন্য দোয়ার আয়োজন করতে চাইলে মার্কেট ও ফ্ল্যাট মালিক সমিতির পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এই মামলায় ইসমাইল হোসেনের পাশাপাশি সমিতির আরও ১০ জন এবং অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
ইসমাইলের বড় ভাই মো. খোরশেদ আলম বাবুল জানান, ফরচুন শপিং কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রভাবশালী পক্ষের মধ্যে তীব্র বিরোধ চলে আসছে। তার অভিযোগ, শ্যাম দুলাল ও নাসির উদ্দিন দুলালের বিরুদ্ধে জাল দলিল তৈরি করে প্লট ও ফ্ল্যাট বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। মার্কেটের অধিকাংশ সদস্য এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় বিরোধ আরও ঘনীভূত হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ইসমাইলকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল। তার ভাইয়ের মেয়েকে চিকিৎসা করিয়ে ফেরার পথে পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা ধস্তাধস্তি করে পকেটে মাদক ঢুকিয়ে দিয়েছে, পুলিশ তাদের কাউকে আটক করেনি, যা প্রমাণ করে পুরো ঘটনাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রমনা থানার ওসি মো. ইয়াসিন মিয়া জানান, ইসমাইলের বিরুদ্ধে করা আগের মামলাটি চাঁদাবাজি ও হুমকির অভিযোগসংক্রান্ত। তবে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রেপ্তারের সময় বডি সার্চ করে এসআই মো. উজ্জ্বল তার প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে ৯০ পিস ইয়াবা পেয়েছেন, যার ভিত্তিতে আইনগতভাবে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুলিশ ফুটেজটি দেখেছে, তবে সেখানে কেউ ইসমাইলের কাছে মাদক দিয়েছে কি না, তা তদন্তের বিষয়। পুলিশের সাথে অভিযুক্তদের যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অনেক সময় বিভিন্ন অভিযোগ আসে, তবে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ইসমাইলকে ধরে ইয়াবা দেওয়ার ঘটনায় পুলিশের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে—এমন কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত পুলিশের কাছে নেই।
সব মিলিয়ে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের দিকে এখন সবার নজর। ডিসি শেখ জাহিদুল ইসলাম পুনরায় আশ্বস্ত করেছেন যে, তদন্তে কোনো পুলিশ সদস্যের দোষ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




















