সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের গুলশানের অভিজাত এলাকায় অবস্থিত দুটি ফ্ল্যাটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ টিমের দুই দিনব্যাপী রুদ্ধশ্বাস অভিযান শেষ হয়েছে। রাজধানী ঢাকার গুলশানের ৬৬ নম্বর রোডে নর্থওয়েস্ট বি ব্লকের ১১ নম্বর প্লটে অবস্থিত এই ফ্ল্যাটগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বিলাসবহুল পণ্য সামগ্রী উদ্ধার করেছে দুদকের বিশেষ টিম। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, অভিযানে মোট ২৬৯ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন পণ্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে, যার মোট সংখ্যার পরিমাণ ১ হাজার ৫০০টি ছাড়িয়ে গেছে।
দুদকের তথ্যমতে, উক্ত বাড়ির ফ্ল্যাট এ-৭ থেকে প্রায় ১ হাজার ১৩৫টি এবং ফ্ল্যাট বি-৭ থেকে প্রায় ৪০০টি পণ্য সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) তানজির আহমেদ এই অভিযানের বিস্তারিত জানিয়ে ঢাকা পোস্টকে বলেন, দুদকের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে। আদালতের দেওয়া নির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে গত দুই দিন ধরে ফ্ল্যাট দুটিতে ইনভেন্টরি বা মালামালের তালিকা তৈরির কাজ চালানো হয়। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও মূল্যবান সামগ্রী পাওয়া গেছে।
উদ্ধারকৃত পণ্যের তালিকায় চোখ কপালে ওঠার মতো বিলাসবহুল সামগ্রীর সমাহার দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩০০টির বেশি দামী কোট, ৫৩২টির বেশি টাই এবং ৮টি ঘড়ির বক্স, যার মধ্যে ৪টি অত্যন্ত দামী রোলেক্স ব্র্যান্ডের ঘড়ি। এছাড়া প্রায় ১০০টি কামিজ, মুক্তার (পার্ল) গয়না, ঝাড়বাতি, বেড, সোফা, এসি, সিলিং ফ্যান, ট্রেড মিল, ফ্রিজ, সুটকেস, চেয়ার ও টেবিলসহ আরও অনেক সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া রোলেক্স ঘড়িগুলোর ক্রয় রসিদ যাচাই করে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘড়ির মূল্য প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে।
ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরপরই সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে দুদক, সিআইডি এবং এনবিআরের সমন্বয়ে একটি সাত সদস্যের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। তবে পরবর্তীতে টিম লিডারের বদলির কারণে এই তদন্ত টিম পুনর্গঠন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে দুদকের উপ-পরিচালক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি শক্তিশালী টিম এই অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করেছে দুদক। এসব মামলায় সাইফুজ্জামান চৌধুরী ছাড়াও তার স্ত্রী এবং ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানকে আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
গত ২ জুলাই আদালতের আদেশ পাওয়ার পর সাইফুজ্জামানের গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটের সঠিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় দুদক। আদালতের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী এবং তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে থাকা গুলশানের রোড নম্বর-৬৬, ব্লক-নর্থওয়েস্ট (বি), প্লট নম্বর-১১-এর ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট এ-৭ এবং ৩ হাজার ৮৩২ বর্গফুট আয়তনের ফ্ল্যাট বি-৭-এর রিসিভার হিসেবে দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাটে রিসিভারের প্রবেশ এবং মালামালের ইনভেন্টরি কার্যক্রমের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমান।
উল্লেখ্য, দেশের অভ্যন্তরে সম্পদের পাশাপাশি বিদেশেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যে তার নামে থাকা ৫১৮টি ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোক করার নির্দেশ দেন আদালত। এর আগে ১৩ জানুয়ারি আরব আমিরাতসহ বিশ্বের আটটি দেশে তার মালিকানাধীন বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে থাকা দুটি কোম্পানিতে করা বিনিয়োগ অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশে থাকা এসব সম্পদ ও বিনিয়োগের মোট পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।











