সরকারি চাকরিতে বদলি একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া। তবে কিছু কর্মকর্তা তাঁদের অনন্য কর্মদক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে দায়িত্বের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। গ্রিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) রাবেয়া বেগম তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর কর্মজীবন এবং সেবামূলক মনোভাব প্রবাসীদের কাছে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রায় চার বছর গ্রিসে দায়িত্ব পালন করার পর, আগামী ২৪ জুলাই তিনি ভুটানে বাংলাদেশ দূতাবাসে একই পদে যোগ দিতে যাচ্ছেন।
গ্রিসে কর্মরত থাকাকালীন রাবেয়া বেগম প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি তাঁর অসামান্য আন্তরিকতা, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সেবামুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ব্যাপক প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাঁর বদলির খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই প্রবাসীদের মাঝে এক ধরনের বিষণ্ণতা ও আবেগের সৃষ্টি হয়েছে। অসংখ্য প্রবাসী তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। তাঁদের অনেকের মতে, রাবেয়া বেগমের বিদায়ের মধ্য দিয়ে গ্রিসের বাংলাদেশি কমিউনিটি একজন প্রবাসীবান্ধব এবং অত্যন্ত মানবিক কর্মকর্তাকে হারাল।
উল্লেখ্য যে, শুধু গ্রিসেই নয়, মাল্টা এবং আলবেনিয়ায় বাংলাদেশের পৃথক কোনো দূতাবাস না থাকায় সেখানকার প্রবাসীদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবাগুলো এথেন্সের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকেই প্রদান করা হয়। রাবেয়া বেগম দায়িত্ব পালনের সময় একাধিকবার সরেজমিনে এই দেশগুলোতে ভ্রমণ করেছেন এবং সেখানকার প্রবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ প্রবাসীদের কাছে অত্যন্ত সহায়ক প্রমাণিত হয়েছে।
গত ১৬ জুলাই এথেন্সে বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে রাবেয়া বেগমের সম্মানে এক জমকালো বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত, দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভিন্ন দেশের প্রভাবশালী কূটনীতিক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সহকর্মীরা রাবেয়া বেগমের সঙ্গে তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতিচারণ করেন এবং তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করেন। এই বিশেষ মুহূর্তে তাঁকে সম্মানস্বরূপ স্মারক উপহার প্রদান করা হয়।
২০২২ সালের শেষ দিকে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে এথেন্সে যোগদান করা রাবেয়া বেগম পরবর্তীতে তাঁর মেধা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ পদোন্নতি পান এবং প্রথম সচিব (রাজনৈতিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজধানী এথেন্সের পাশাপাশি গ্রিসের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা, কনস্যুলার সেবাগুলোকে আরও সহজলভ্য করা এবং প্রবাসীদের নানা সংকটে পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি পুরো কমিউনিটির কাছে একজন আস্থাভাজন এবং নির্ভরযোগ্য কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান।
প্রবাসীদের অনেকের দৃষ্টিতে, রাবেয়া বেগমের এই বিদায় কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তার রুটিনমাফিক বদলি নয়; বরং এটি একজন আন্তরিক এবং অভিভাবকসুলভ মানুষের প্রস্থান। তাঁর পেশাদারিত্ব, কর্মনিষ্ঠা এবং মানবিক আচরণ গ্রিসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের স্মৃতিতে দীর্ঘকাল অম্লান হয়ে থাকবে। উল্লেখ্য, রাবেয়া বেগমের গ্রামের বাড়ি সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায়। তাঁর নতুন কর্মস্থল ভুটানেও তিনি একইভাবে দেশের সেবা করবেন—এমন প্রত্যাশায় তাঁর সহকর্মী ও প্রবাসীরা।










