জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অসীম কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক এবং ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি মনে করেন, দল-মত-পথ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেন, তবেই শহীদদের স্বপ্নের সেই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

বুধবার (১৫ জুলাই) ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ এবং নিপীড়নমূলক ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আপামর জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক তীব্র বিস্ফোরণ।

এই বেদনাবিধুর দিনে রাষ্ট্রপতি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সকল বীর শহীদের অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, "আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই সকল সাহসী তরুণ-তরুণী এবং যুবপ্রজন্মকে, যারা এই আন্দোলনে আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন এবং আজও অসহনীয় যন্ত্রণাময় জীবনযাপন করছেন।"

একই সঙ্গে তিনি শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, যারা আপনজন হারানোর অপূরণীয় শোক বুকে ধারণ করেও অসীম ধৈর্য ও সাহসের পরিচয় দিয়ে চলেছেন, তাদের অবদান অবিস্মরণীয়। রাষ্ট্রপতি তাঁর বার্তায় জুলাই যোদ্ধা এবং গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল দেশপ্রেমিক নাগরিকের ত্যাগ ও অবদানকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন ১৬ জুলাই রংপুরের আবু সাঈদের কথা। আবু সাঈদের প্রসারিত হাত এবং বুক পেতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ সেই মুহূর্তটি আন্দোলনকে এক নতুন মোড় দেয় এবং এর তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একই দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও বেশ কয়েকজন তরুণের আত্মাহুতি এই গণআন্দোলনকে এক চূড়ান্ত রূপ প্রদান করে। পরবর্তীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আটক, জেল-জুলুম এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ জনতার রাজপথে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলন একটি পূর্ণাঙ্গ গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

রাষ্ট্রপতি জোর দিয়ে বলেন, এই অর্জন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক কৃতিত্ব নয়; বরং এটি ছিল গণতন্ত্রকামী সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা, অদম্য সাহস এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ফসল। রাষ্ট্রপতি তাঁর বার্তায় স্মরণ করিয়ে দেন যে, জুলাইয়ের শহীদদের আত্মদান আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে—রাষ্ট্রের শক্তির প্রকৃত উৎস এবং সর্বময় ক্ষমতার মালিক হলেন জনগণ। জনগণের মৌলিক অধিকার, স্বার্থ, মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ও প্রধান দায়িত্ব। জুলাইয়ের এই চেতনা আমাদের একটি মানবিক, স্বৈরাচারমুক্ত, সমতাভিত্তিক এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের পথে অবিরাম প্রেরণা জোগাবে।

বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শহীদ ও আহত জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদান, তাদের পরিবারের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং আহতদের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসনের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রপতি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং মানবিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

পরিশেষে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সকলকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ—একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক সৌহার্দপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনে ঐক্যবদ্ধ হই। তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মদানকারী সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত ও শাশ্বত শান্তি কামনা করেন এবং ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে গৃহীত সকল কর্মসূচির সর্বাঙ্গীণ সফলতা কামনা করে তাঁর বাণী শেষ করেন।