মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় পরপর কয়েকটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠেছে টেকনাফের সীমান্ত অঞ্চল। এই আকস্মিক ঘটনায় নাফ নদী সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিট থেকে ৯টা ৪২ মিনিটের সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে চার দফা ভারী মর্টার শেল বা বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো সীমান্তবর্তী এলাকা। এর ফলে টেকনাফের জাদিমুড়া থেকে শুরু করে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদের বাসিন্দারা তীব্র আতঙ্কে তাড়িত হন।
শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদী সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. আনিছুর রহমান সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে বলেন, “হঠাৎ করে আমি এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠছে। আমি পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদীর ওপারে আগুনের লেলিহান শিখা স্পষ্টভাবে দেখা গিয়েছিল। মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, আগুনের সেই ঝলক আমাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। বিস্ফোরণটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই ঘটেছে। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি আরাকান আর্মির ছোড়া মর্টার শেলের বিস্ফোরণ হতে পারে।”
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ জানান, দীর্ঘ বিরতির পর মিয়ানমারে আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব টেকনাফ সীমান্তেও পড়েছে। তিনি বলেন, “বিস্ফোরণের তীব্র শব্দে মানুষের ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। আতঙ্কে অনেকে দিশেহারা হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায় চলে আসেন। বিশেষ করে শিশু এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য এই ধরনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং ঝুঁকিপূর্ণ।”
উল্লেখ্য যে, সর্বশেষ গত ২৮ ডিসেম্বরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও জান্তা সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মর্টার শেল ও মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কাঁপছিল উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর আরাকান আর্মির দখলে থাকা রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা পুনরায় উদ্ধারে জান্তা সরকার নতুন করে অভিযান শুরু করেছে।
টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা মো. ইসলাম বলেন, “প্রায় সাত মাস পর আবারও মিয়ানমারের দিক থেকে গোলাবর্ষণের শব্দ শুনলাম। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে চারবার বিকট বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। শুরুতে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হচ্ছে, কিন্তু পরে বুঝতে পারি যে সীমান্তের ওপার থেকেই এই শব্দ আসছে।”
এই পরিস্থিতি নিয়ে সাবরাং ইউপি সদস্য আবুল ফয়েজ পুনরায় সতর্ক করে বলেন, “মিয়ানমারে আবারও যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে টেকনাফের সীমান্ত কেঁপে উঠেছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অনেক মানুষ ভয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে এমন আকস্মিক ঘটনায় শিশু এবং বয়স্কদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, এমনকি তাদের হার্টবিট দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
টেকনাফ ব্যাটালিয়ন (২ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, “আজ রাত ৯টার দিকে মিয়ানমারের মংডু এলাকার সীমান্তের ওপারে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। ওই গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও স্পষ্টভাবে শোনা গেছে, যার প্রভাবে অনেক স্থানে ঘরবাড়ি কেঁপে উঠেছে। বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করতে আমি নিজেই এখন সীমান্ত এলাকায় যাচ্ছি।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি। তবে প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এই গোলাগুলি চলছে।”
অন্যদিকে, টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস. এম. অনীক চৌধুরী বলেন, “মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলাগুলির বিকট শব্দ টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও শোনা গেছে। তবে আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।”











