বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা এবং জাতীয় পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)-এর কেন্দ্রীয় ও কাউন্সিল সদস্য মেঘমল্লার বসুকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) তার পাকস্থলী পরিষ্কার (স্টমাক ওয়াশ) করার পর চিকিৎসকরা তাকে বর্তমানে শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন। তবে তাকে এখনও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং তিনি কথা বলার মতো অবস্থায় নেই বলে জানা গেছে।

ফেসবুকে একটি সুইসাইড নোট পোস্ট করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং দলীয় নেতাকর্মীরা দ্রুত তার খোঁজ শুরু করেন। অবশেষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের পাশে তাকে নিথর অবস্থায় পাওয়া যায়। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মেঘমল্লার বসুর ফেসবুক পোস্টটি দেখার পরপরই তারা তার সন্ধানে নেমেছিলেন। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিলেও প্রথমে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটের কাছে তাকে পাওয়া যায় এবং দ্রুত উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধার করার পর দ্রুত তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে সেখানে তার চিকিৎসায় অনীহা প্রকাশ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তার পাকস্থলী ওয়াশ করার পর তিনি স্থিতিশীল হন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও কথা বলার মতো অবস্থায় নেই।

ফেসবুকে পোস্ট করা আবেগঘন সুইসাইড নোটে মেঘমল্লার বসু তার জীবনের গভীর হতাশা ও শূন্যতার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘জীবনটা একটা বৃত্তের মতো। অনেক ঘুরে, অনেক কিছু করে নিজেকে আবার শূন্যে আবিষ্কার করার মতো। আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, দুটি আলাদা আলাদা সময়ের যেকোনো একটিতে মরে গেলে খুব ভালো হতো। একটি ২০২০ সালের শুরুতে, আমার শেষ বাংলা বিতর্কের দিন, গভর্মেন্ট সায়েন্স কলেজের ফাইনালের পর। অন্যটি মনে হয় গত বছর ডাকসু নির্বাচনের পর। ওই দুটি সময়েই আমি নিজেকে অনেক পূর্ণ মনে করতাম। যখন মানুষ পূর্ণ থাকে, তখন সে ভুলে যায় যে শূন্যতাই তার নিয়তি।’

নিজের অপরাধবোধের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও লিখেছেন, ‘আজ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হতাশা আর অপরাধবোধ ছাড়া আমার আর কিছুই নেই। আমি সবচেয়ে বড় অপরাধ করছি আমার মায়ের সাথে। আমি জানি তার আর কেউ নেই, তবুও আমি এই পথ বেছে নিচ্ছি। কোনোভাবেই তো এই চক্র থেকে বের হতে পারছি না। আর কতদিন সম্ভব? আমি জানি আপনারা অনেকে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী। আপনারা পারলে আমার মাকে একটু বাঁচিয়ে রাখবেন। মিশু ভাই, নূর আপু, আরাফাত ভাই, উৎপল দা, নিমাই কাকু—সবাই মিলে আমাকে বাঁচিয়ে রাখার অনেক চেষ্টা করেছেন। আমি সবাইকে ব্যর্থ করে দিয়ে যাচ্ছি।’

তার প্রাক্তন প্রেমিকা চূড়াকে নিয়ে বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আপনাদের সবার প্রতি একটি একান্ত অনুরোধ, আমার প্রাক্তন প্রেমিকা চূড়াকে যেন কোনোভাবেই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী করা না হয়। আমাকে জীবনে কোনো মানুষ যতটা ভালোবাসা দিয়েছে, তিনি তার চেয়ে বেশি দিয়েছেন। আমার আগের চেষ্টার পর সবাই ভেবেছিল দোষ উনার। তিনি একজন ভিলেনে পরিণত হয়েছেন। অথচ বাস্তবতা হলো, আমি তাকে যতটা ইনসিকিউরিটি অনুভব করিয়েছি, তাতে তার দশবার আত্মহত্যার চেষ্টা করার কথা ছিল। তিনি আমার জন্য শুধু উজাড় করে দিয়েছেন, বিনিময়ে কিছুই পাননি। আমার কারণে তিনি যে কষ্ট পেয়েছেন, তা আর এক ছটাক বাড়লে আমার পাপ বাড়বে। তিনি এখনও তার মাকে নিয়ে এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আমার অবস্থা নিয়ে তাকে কেউ কিছু বললে বা মনে করলে শুধুই আমার পাপ বাড়বে।’

রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘আমার বন্ধুরা, সহযোদ্ধারা—সবার কাছে আমি ঋণী ও পাপী। আমি আমার রাজনৈতিক পরিসর থেকে ব্যক্তিজীবনের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা পাইনি। সেসব কথা আর বলে কী হবে। বাবার ব্যাংকের একটি লোন আছে, দয়া করে কেউ সেটি শোধ করে দিয়েন। আমার চিকিৎসার পেছনে অযথা টাকা খরচ করবেন না। পারলে আমাকে বাবার পাশে সমাধি দিয়েন।’