সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এক গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের সেই নৃশংস ঘটনায় আদালতের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এই মামলায় প্রধান অভিযুক্তসহ একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং আরও তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছেন সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে দণ্ডিত প্রত্যেকের এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় চার আসামিকে আদালত খালাস দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুর ২টায় ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন সাইফুর রহমান, যিনি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়া গ্রামের মো. তাহিদ মিয়ার সন্তান। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন হবিগঞ্জ জেলা সদরের বাগুনীপাড়ার শাহ মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক এবং জকিগঞ্জ আটগ্রামের মরিচা এলাকার অমলেন্দু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমান নামের চারজনকে আদালত খালাস প্রদান করেন। জানা গেছে, দণ্ডিত ও খালাসপ্রাপ্তরা সবাই স্থানীয় ছাত্রলীগের টিলাগড়কেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
সিলেট দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন জানান, রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে আসামিদের অপরাধ যথাযথভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে আদালত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে এই রায় দিয়েছেন। রায় ঘোষণার আগে বিচারক ৯১ পৃষ্ঠার বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ পাঠ করেন, যেখানে ঘটনার ভয়াবহতা ও প্রমাণাদির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচিত এই ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণার জন্য বেলা সাড়ে ১১টায় আট আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে গত বুধবার আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত ১৪ জুলাইয়ের তারিখটি রায়ের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হওয়ার পর গত বছরের মে মাস থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই বিচার প্রক্রিয়ায় মোট ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন ধর্ষণের শিকার ওই গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। এই সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া গিয়েছিল।
ঘটনার প্রেক্ষাপট দেখা যায়, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে এই নারকীয় ঘটনাটি ঘটে। ওইদিন এক নবদম্পতি সিলেটের শাহপরান মাজারে ঘুরতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তারা নগরের টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে তাদের প্রাইভেটকারটি থামান। স্বামী পার্শ্ববর্তী একটি দোকানে গেলে সুযোগ বুঝে একদল তরুণ তাদের গাড়িটি ঘিরে ধরে। এরপর জোরপূর্বক দম্পতিকে বালুচর এলাকার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীর সামনেই ২০ বছর বয়সী ওই নববিবাহিত তরুণীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে অভিযুক্তরা। শুধু ধর্ষণই নয়, তারা দম্পতিকে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় এবং তাদের গাড়িটি আটকে রাখে।
ঘটনার রাতেই ভুক্তভোগীর স্বামী শাহপরান থানায় ছয়জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং দুইজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা দায়ের করেন। এছাড়া প্রাইভেটকার আটকে রেখে চাঁদাবাজির ঘটনায় আরও একটি মামলা হয়। মামলা দুটি প্রথমে পৃথকভাবে চললেও পরবর্তীতে উভয় মামলা একসঙ্গে বিচার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা পরবর্তীতে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য গ্রেপ্তারকৃত আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট জমা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং ২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর অবশেষে এই রায় ঘোষণা করা হলো।











