বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. দিদারুল আলমের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন। ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, কাফরুল থানার একটি হত্যা মামলায় ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পেশ করেন। মামলাটি ২০২৫ সালের ৫ মার্চ নথিভুক্ত করা হয়েছিল। তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং তৎকালীন সরকারের পতনের দাবিতে দেশজুড়ে ছাত্র-জনতা রাজপথে নামে। এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুরো দেশ এক উত্তাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যায়।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের 'রাজাকারের বাচ্চা' বলে অভিহিত করেন। এই বক্তব্যের পর আসামিরা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও সহিংস মনোভাব ছড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে যখন ১৫ জুলাই ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে একটি যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আন্দোলন দমনে নেতাকর্মীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো, পরদিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই সকালে আসামিদের নির্দেশে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এছাড়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনসহ অন্যান্য আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশনায় পুলিশ ও দলীয় ক্যাডাররা আন্দোলন দমনের নামে গুলি চালায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তে আরও দাবি করা হয়েছে যে, কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকায় বিভিন্ন ফ্ল্যাটে বসে আসামিরা গোপন বৈঠক করে আন্দোলন দমনে সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগের সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা করেছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে হতাহতের ঘটনার বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৮ জুলাই রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশে স্থানীয় ও তৎকালীন সরকারের লোকজন আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে ও অতর্কিত হামলা চালায়। এই হামলার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. তরিকুল ইসলাম রুবেলসহ অনেকে নিহত হন এবং বহু মানুষ গুরুতর আহত হন। তদন্তে ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর এই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও সংশ্লিষ্টতার জোরালো তথ্য পাওয়া গেছে দাবি করে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদনটি মঞ্জুর করেন।
উল্লেখ্য, অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৭ সালের জুন থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। তবে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৫ সালের জুনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় গোয়েন্দা পুলিশ ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট তাকে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার করে এবং পরে কারাগারে পাঠায়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জুনে হাইকোর্ট থেকে তিনি এই দুর্নীতি মামলায় জামিন পান। তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় উত্তরা এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় চলতি বছরের ৩০ জুলাই তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছিল। বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি কারাগারে আটক রয়েছেন। এবার কাফরুল থানার এই হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ আসায় তার আইনি জটিলতা আরও বৃদ্ধি পেল।




















