বাংলা ভাষায় ‘গুনাহ’ শব্দটি অত্যন্ত বহুল প্রচলিত হলেও এর ভাষাগত উৎস মূলত ফার্সি। সাধারণভাবে গুনাহ বলতে কোনো অন্যায়, পাপ বা অহিত কাজকে বোঝানো হয়। ইসলামি জীবনদর্শনে, মহান রাব্বুল আলামিনের নির্দেশনার পরিপন্থী প্রতিটি কাজই গুনাহ বা পাপ হিসেবে বিবেচিত। শরীয়তের দৃষ্টিতে গুনাহ মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে— ‘সগিরা’ বা ছোট গুনাহ এবং ‘কবিরা’ বা বড় গুনাহ।
গুনাহর এই বিভাজনটি আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন নেক আমল, ইবাদত কিংবা মানুষের প্রতি দয়ার মাধ্যমে সগিরা বা ছোট গুনাহ ক্ষমা করা সম্ভব। তবে কবিরা বা বড় গুনাহের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কবিরা গুনাহ মাফ করার জন্য মহান আল্লাহর কাছে খাঁটি হৃদয়ে তওবা করা অপরিহার্য। হাদিসের সতর্কবাণী অনুযায়ী, কোনো কোনো কবিরা গুনাহের ক্ষেত্রে যদি তওবা না করে মৃত্যু ঘটে, তবে সেই ব্যক্তি নিশ্চিত জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই গুনাহর কালিমা থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় পবিত্র হতে মহান রবের কাছে খাঁটি তওবার কোনো বিকল্প নেই।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ইমানদারদের উৎসাহিত করে ইরশাদ করেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো, যাতে তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করেন এবং তোমাদের এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করান, যার তলদেশে ঝর্ণাসমূহ প্রবহমান।’ (সুরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮)।
তবে মানুষের স্বভাবজাত দুর্বলতা এবং শয়তানের ধোঁকায় পড়ে অনেক সময় দেখা যায়, তওবা করার পর মানুষ পুনরায় একই গুনাহে লিপ্ত হচ্ছে। কেউ কেউ গোপনে, আবার কেউ প্রকাশ্যে বারবার একই পাপের পুনরাবৃত্তি করেন। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা অনেকের জন্যই বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক পথে ফিরে আসার উপায় কী? এই বিষয়ে জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর অভিমত হলো—যদি একই গুনাহ বারবার হয়ে যায়, তবে হতাশ হয়ে তওবা করা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বরং বারবার তওবা করতে হবে। মহান আল্লাহ তা’য়ালার গুণবাচক নামগুলোর একটি হলো ‘তাওয়াব’। এর অর্থ হলো—যিনি বারবার তওবা কবুল করেন। সুতরাং, গুনাহ যতবারই হোক না কেন, ততবারই মহান রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে এবং গুনাহ মাফ চাইতে হবে।
গুনাহর পর খাঁটি তওবা করলে আল্লাহ কতটা আনন্দিত হন, তা অনুধাবন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা’য়ালা বান্দার তওবার কারণে সেই লোকটির চাইতেও বেশি খুশি হন, যে ব্যক্তি মরুভূমিতে নিজের উট হারিয়ে ফেলে এবং পরে তা পুনরায় ফিরে পায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৭০)।
আল্লাহর ৯৯টি নামের মধ্যে ‘তাওয়াব’ (التواب) বা তওবা কবুলকারী, ‘আল-আফুর’ (الْعَفُوُّ) বা গুনাহ ক্ষমাকারী এবং ‘আল-গাফুর’ (الْغَفُورُ) বা পরম ক্ষমাশীল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই তওবার পরও বারবার একই গুনাহ হয়ে গেলে কোনোভাবেই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। বরং খাঁটি তওবা অব্যাহত রেখে গুনাহ থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বলো, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছো তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)। এছাড়াও সূরা ইউসুফের ৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না, কেননা কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না।’











