ফুটবল নিয়ে ক্রমবর্ধমান উন্মাদনা, মাঠের বাইরের মারামারি এবং চরম হতাশায় আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনপ্রিয় ইসলামি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ। সম্প্রতি এক অনলাইন প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে তিনি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেন এবং সতর্ক করেন যে, একটি খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাণ হারানো অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন মুমিনের জন্য এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন।

বর্তমান সমাজের এই অস্থির বাস্তবতাকে তুলে ধরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে আমাদের দেশে প্রতিবছরই খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে মানুষের প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একজন ইমানদারের জীবন কি এতটাই সস্তা হয়ে গেল যে, অন্য কোনো দেশের খেলোয়াড়রা হারল নাকি জিতল, তা নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত হব? এমনকি এই উন্মাদনা এখন খুনের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে, এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে কেবল খেলার মতপার্থক্য বা উত্তেজনার কারণে পানিতে চুবিয়ে মেরে ফেলেছে। এই ধরণের উন্মাদনা যারা পরিকল্পিতভাবে তৈরি করছেন এবং যারা একে সীমাহীনভাবে প্রশ্রয় দিয়ে সীমানার বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন, তারা এই মর্মান্তিক ঘটনার দায় থেকে কোনোভাবেই মুক্তি পাবেন না।

কুষ্টিয়ায় এক ব্যক্তির আত্মহত্যার হৃদয়বিদারক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, প্রিয় দল হেরে যাওয়ার পর প্রতিপক্ষের কটূক্তি ও বিদ্রূপ সহ্য করতে না পেরে ওই ব্যক্তি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। অথচ তার ঘরে স্ত্রী এবং ছোট ছোট সন্তান রয়েছে, যারা এখন অভিভাবকহীন। এমন ঘটনা কেবল বেদনাদায়কই নয়, বরং এটি চরম অবুঝিতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, খেলাধুলা বা বিনোদন ইসলামে নিষিদ্ধ নয়, তবে তা অবশ্যই শরিয়তের নির্ধারিত সীমানার মধ্যে হতে হবে। যখন বিনোদন জীবনের মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় এবং সীমা অতিক্রম করে, তখন তা অকল্যাণ ডেকে আনে। এই প্রসঙ্গে তিনি মহান আল্লাহর বাণী উদ্ধৃত করে বলেন, ﴿وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ﴾ যার অর্থ: "তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।" (সুরা আল-আনআম, আয়াত: ১৪১)।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, খেলাধুলা এবং বিনোদন মানুষের জীবনের একটি অংশ হতে পারে এবং শরীয়তের সীমানার মধ্যে থেকে তা করতে ইসলাম নিষেধ করে না। কিন্তু যখন মানুষ আল্লাহ তাআলার বেঁধে দেওয়া সীমানা অতিক্রম করে, তখন সেখানে আজ হোক বা কাল চরম অকল্যাণ নেমে আসবেই। মানুষ হয়তো অনেক পরে এই সত্য উপলব্ধি করবে, কিন্তু ততদিনে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে এবং অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে।

সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, একজন মুমিনের জন্য শারীরিকভাবে সুস্থ থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। নিয়মিত ব্যায়াম করা, পরিমিত খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং শরীরের জন্য উপকারী খাদ্য গ্রহণ করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ। এই বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করে তিনি বলেন, «الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ" যার অর্থ: "শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক উত্তম ও প্রিয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)।

পাশাপাশি পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষকে হালাল ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সুরা আল-বাকারার ১৬৮ নম্বর আয়াতের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে: ﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا﴾ অর্থ: "হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার করো।"

শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, একজন প্রকৃত মুসলমানের উচিত এমন জীবনধারা অনুসরণ করা, যা তার দুনিয়া ও আখিরাত—উভয় জগতের জন্য কল্যাণকর হবে। খেলাধুলা শরীরচর্চা এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই এমন উন্মাদনায় রূপ নিতে পারে না যার কারণে মানুষের জীবন চলে যায়। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে, তাদের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তাই খেলার নামে অন্ধ উন্মাদনা পরিহার করে সংযমী হওয়া এবং অহেতুক কাজে সময় নষ্ট না করাই একজন সচেতন মুসলমানের প্রধান দায়িত্ব।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, ইসলাম বিনোদনকে নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ করে না, তবে প্রতিটি কাজের একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। যে কাজের পেছনে দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো বাস্তব লাভ নেই, এমন অনর্থকতা ইসলাম সমর্থন করে না। তিনি পরামর্শ দেন, আপনি খেলাধুলা করুন যাতে শরীরে ব্যায়াম হয়, ঘাম ঝরে এবং আপনি সুস্থ থাকেন—সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কোনো কিছু যদি আপনার আনন্দের কারণ হয় এবং তা শরিয়তের সীমার মধ্যে থাকে, তবে তা করতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না।

সবশেষে তিনি আহ্বান জানান, যারা খেলার নামে এই অন্ধ উন্মাদনার মধ্যে লিপ্ত হচ্ছেন এবং এর পেছনের সামাজিক ও নৈতিক অনাচারগুলো খেয়াল করছেন না, তাদের উচিত অবিলম্বে এই পথ পরিহার করা। একজন মুসলমানের জীবন এবং ইসলাম তখন সুন্দর হবে, যখন সে অহেতুক ও অনর্থক কাজ পরিহার করে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং মানবকল্যাণের পথে চলবে।