বেসরকারি মোবাইল অপারেটরগুলো তরঙ্গ নবায়নের ক্ষেত্রে একের পর এক ছাড় ও বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে। আগের তুলনায় কমানো হচ্ছে তরঙ্গের দাম, বাড়ানো হচ্ছে মূল্য পরিশোধের কিস্তির সংখ্যা। ১৫ বছরের ফি পরিশোধেও মিলছে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা। এর মধ্যেই নিয়মিত বার্ষিক চার্জ তুলে দেওয়ার মতো দাবি জানিয়েছে অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)। আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে।
সেই তরঙ্গ নবায়নে অপারেটররা হাজার কোটি টাকার অভাবনীয় আর্থিক সুবিধা পেতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইল অপারেটররা শুধু আর্থিক ছাড় ও সুবিধা ভোগ করবেন, অথচ গ্রাহকদের উন্নত সেবা দেওয়ার দায়িত্ব নেবেন না, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি অপারেটরদের কাছ থেকে সেবার মানোন্নয়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার আদায় করতে হবে। নিম্নমানের নেটওয়ার্ক, ঘন ঘন কলড্রপ ও ইন্টারনেটের ধীরগতিতে জিম্মি গ্রাহকদের দুর্ভোগ কমানোর নিশ্চয়তাও নিতে হবে। মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে মোবাইল অপারেটরদের কাছে গ্রাহকরা একপ্রকার জিম্মি হয়ে আছেন। অপারেটররা সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিলেও গ্রাহকদের নিম্নমানের সেবা দিচ্ছে। তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার আগেই গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। অপারেটররা বিপুল মুনাফা করলেও গ্রাহকদের কলড্রপ, দুর্বল নেটওয়ার্ক ও ধীরগতির ইন্টারনেটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তরঙ্গের দাম কমানো ও কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা দেওয়া হলে এর সুফল গ্রাহকদেরও দিতে হবে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার শর্ত আরোপ করতে হবে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ছাড় প্রত্যাহারসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জুয়েল বলেন, প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ ও লাইসেন্সের মেয়াদসংক্রান্ত প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকার সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপারেটরদের পক্ষ থেকে এমটব চিঠি দিয়ে তাদের দাবি-দাওয়া জানাচ্ছে। তারা তাদের দাবি জানাতেই পারে।
তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এসব তরঙ্গ নবায়নে প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নির্ধারিত দাম চূড়ান্ত করার সুপারিশ জানিয়ে গত ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠায় সংস্থাটি। এতে ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের দাম ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৯৮ কোটি এবং ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। এই দাম আগের তুলনায় গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ কম। এর বাইরে অপারেটরদের কিস্তিতে তরঙ্গের মূল্য পরিশোধের সুবিধা দেওয়ারও প্রস্তাব রয়েছে। তবে এতেও সন্তুষ্ট নয় বেসরকারি মোবাইল অপারেটররা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর পাঠানো চিঠির প্রস্তাব সংশোধন করে গত ২২ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে আবারও সংশোধিত প্রস্তাব পাঠায় বিটিআরসি। এতে স্পেকট্রাম লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করার পাশাপাশি মূল্য পরিশোধের কিস্তি ৮টি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করার সুপারিশ করা হয়। এরপরও মন ভরেনি মোবাইল অপারেটরদের। মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানো ও অর্থ পরিশোধের শর্ত শিথিলের দাবি তুলেছে এমটব। গত ২৫ অক্টোবর বিটিআরসির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীকে চিঠি দেন সংগঠনের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার। এবার তারা ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্সের মেয়াদ চায়। পাশাপাশি কিস্তির মেয়াদ ২০ বছর করা ও তরঙ্গ নবায়নে বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে তারা।
এতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব ও অপারেটরদের আর্থিক সুবিধার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপারেটরদের এই দাবি মেনে নেওয়া হলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হতে পারে। বিটিআরসির প্রস্তাবিত ২০ বছরের মূল্যকাঠামোর পরিবর্তে ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের মেয়াদ দেওয়া হলে স্পেকট্রাম ফি বাবদ সরকারের সম্ভাব্য আয় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে। অথচ বিটিআরসির সর্বশেষ ৩১২তম কমিশন সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে স্পেকট্রাম বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তির সুবিধা রাখার প্রস্তাব করা হয়। সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের মেয়াদ ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত থাকায় প্রাথমিক প্রস্তাবে ১৫ বছরের পরিবর্তে অবশিষ্ট ১২ বছর চার মাসের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ এবং আটটি সমান কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। প্রথম কিস্তি নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে, দ্বিতীয়টি পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এবং বাকি ছয়টি পরবর্তী বছরগুলোতে পরিশোধের প্রস্তাব ছিল। তবে কমিশন সভায় এসব শর্ত আরও নমনীয় করার পেছনের কারণ এখনো অজানা রয়ে গেছে।


















