ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টায় আসনটির ১৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল ৪টায় শেষ হয়। ভোট শেষ হওয়ার পরপরই কেন্দ্রগুলোতে ভোট গণনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল সংগ্রহ ও সমন্বয় শেষে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা করা হবে বলে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটাররা শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। কোথাও কোনো সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, ভোটারদের পরিচয় যাচাই করে নির্ধারিত নিয়ম মেনেই ভোট নেওয়া হয়েছে। সকালে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। নির্বাচন কার্যালয় জানিয়েছে, বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে ভোটগ্রহণ শেষে চূড়ান্ত ভোটের হার এখনো জানানো হয়নি।

বিভিন্ন বয়সী ভোটারের উপস্থিতিতে কেন্দ্রগুলোতে ছিল উৎসবের আমেজ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ ৮০ বছর বয়সী নুরজাহান বেগম ভাতিজির হাত ধরে ভোট দিতে আসেন। তিনি বলেন, বয়স হয়েছে, কোমরের হাড় ক্ষয়ে গেছে। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। তবুও ভাতিজির হাত ধরে আজ ভোট দিতে এসেছি। এদিন তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে নারী ভোটারদের সরব উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া। প্রথমবার ভোট দিতে পেরে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আবার আট মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার ভোট দিতে পেরে অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পর কেউ কেউ স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করেন।

উপনির্বাচন ঘিরে ভোটকেন্দ্রগুলোতে নেওয়া হয়েছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি মাঠে দায়িত্ব পালন করেছেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ও আনসার-গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।

এদিকে সকালে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে দেখা যায়। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন সকাল ৮টার দিকে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। পরে ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি অভিযোগ করেন, ডাব মার্কার এজেন্টরা সবাই জামায়াতের এজেন্ট হয়ে গেছে। জামায়াতের এজেন্টরা ডাব মার্কার কাগজ নিয়ে কেন্দ্রে ঢুকে গেছে।

অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পৌর শহরের হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেন। এরপর তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভোটকেন্দ্রে এসে প্রথমেই যে বিষয়টি উদ্বেগজনক মনে হয়েছে, তা হলো প্রিজাইডিং অফিসারের কার্ডে কোনো ছবি নেই। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারদের গলার কার্ডেও ছবি নেই। যিনি প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন, তার ছবি না থাকলে কীভাবে বুঝব উনিই সেই ব্যক্তি। অন্য কেউ এখানে প্রক্সি দিতে পারেন, এটি খুবই উদ্বেগজনক।

নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের তিন উপজেলায় মোট ১৮৫টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১১৩টি, নবগঠিত রুহিয়া উপজেলায় ৩৩টি এবং ভুল্লী উপজেলায় ৩৯টি। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৫ হাজার ৮৫৩ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৫৭ হাজার ২১৯ জন, নারী ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার চারজন। এছাড়া পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ২৮৭ জন, যাদের মধ্যে পুরুষ ২৪৯ জন ও নারী ৩৮ জন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর যাচাই-বাছাই শেষে এ আসনের উপনির্বাচনে ছয়জনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়। তারা হলেন বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন ও মো. ওবায়দুল্লাহ মাসুদ, জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর দেলাওয়ার হোসেন, হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম, মো. আবদুল আলীম নিজামী এবং হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক। তবে ৫ অক্টোবর দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন বিএনপির জেলা সহসভাপতি মো. ওবায়দুল্লাহ মাসুদ। ফলে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন পাঁচজন। তাদের মধ্যে মির্জা ফয়সল আমীন ও দেলাওয়ার হোসেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।

গত ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদকে ২৫৫ ভোটে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আসনটি শূন্য হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই এ উপনির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৪ ভোট। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. খাদেমুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৮৩৩ ভোট। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। এখন উপনির্বাচনের মাধ্যমে এ আসনের নতুন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।