জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান সরকার ক্রমশ ফ্যাসিজমের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদেরকে এই ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দলীয় ইউনিট সভাপতিদের সম্মেলন শেষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকদের সামনে তিনি এই কঠোর মন্তব্য করেন।

অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, জুলাই সনদের লক্ষ্য পূরণের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক দল যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছিল। সেই সনদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে এই সনদ বাস্তবায়ন করবে। তবে তার অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর সরকার এই প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং এখন একে অস্বীকার করার চেষ্টা করছে। আগামী সেপ্টেম্বরে এই ১৮০ দিনের সময়সীমা পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার দ্রুত সংসদ অধিবেশন ডেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। অন্যথায়, দেশের সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে এই সনদ বাস্তবায়নে জোরালো আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

প্রশাসনিক বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সরকার সর্বক্ষেত্রেই দলীয়করণ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা পরিষদসহ সকল উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দলীয় প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে যদি কোনো দলীয় সরকার না থেকে নিরপেক্ষ প্রশাসক নিযুক্ত থাকতো, তবে তা বৈধ হতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে একটি দলীয় নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া আইনত সঠিক নয়। তিনি দাবি করেন, সরকার যদি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ করে দেয়, তবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি ইঙ্গিত করে বলেন, এ দেশে এমন একজন মন্ত্রী রয়েছেন যিনি সব বিষয়েই কথা বলেন এবং প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেন। জাতীয় সংসদের বিরোধী দলকে খাটো করার চেষ্টা করছেন তিনি। অথচ তার নিজের মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা দেশের আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতির বিষয়ে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিস্থিতি নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বর্তমানে দৃশ্যমান কোনো প্রকৃত উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে না। বরং সব জায়গায় শুধু সরকার দলীয় কর্মীদের পারস্পরিক কোন্দল ও মারামারি পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চরম বৈষম্য চলছে এবং বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের আসনে সুষম বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না।

বিশেষ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য তার নিজ এলাকায় উন্নয়ন কাজ পরিচালনা করবেন, উদ্বোধন করবেন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন—এটাই স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বর্তমান সরকার বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকায় সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদেরকে ‘দারোয়ান’ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে উন্নয়ন তদারকির জন্য, যা অত্যন্ত বেমানান এবং অপমানজনক। এতে করে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি প্রস্তাব করেন, যেহেতু বিরোধী দলের ১৩ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন, তাই সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের এলাকায় আমাদের নারী সংসদ সদস্যদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হোক।

এই সভায় কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহজাহান, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা জামায়াতের আমির মাহফুজুর রহমান, সেক্রেটারি বেলাল হোসাইন, ঢাকা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ভিপি সাহাব উদ্দিন, পৌরসভা জামায়াতের আমির মাওলানা ইব্রাহিম, সেক্রেটারি মোশারফ হোসেন ওপেলসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।