মেহেরপুরের গাংনীতে পরীক্ষার হলে বই খুলে পরীক্ষা দেওয়ার দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে গিয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছেন দুই গণমাধ্যমকর্মী। অভিযুক্ত শিক্ষকদের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরাও এই হামলায় অংশ নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। মারধরের পাশাপাশি তাদের প্রয়োজনীয় পেশাগত সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া এবং একটি কক্ষে আটকে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। পরে কৌশলে মুক্তি পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে থানায় অভিযোগ জানাতে গেলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।

ঘটনাটি ঘটে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার কাজিপুর ডিগ্রি কলেজে। ওইদিন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষা চলছিল। হামলার শিকার হওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা হলেন—নাগরিক টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি রাব্বি এবং দৈনিক খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধি তারিক।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক রাব্বি ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, ৫০০ টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের বই দেখে পরীক্ষা লেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে—এমন একটি সংবাদের সূত্র ধরে তারা পরীক্ষা কেন্দ্রে যান। সেখানে পৌঁছে তারা প্রত্যক্ষ করেন যে, পরীক্ষার্থীরা প্রকাশ্যেই বই খুলে পরীক্ষা দিচ্ছে। এই অনিয়মের দৃশ্য ভিডিওতে ধারণ করতে গেলে কলেজের শিক্ষক মনিরুজ্জামান বিপ্লবসহ আরও কয়েকজন শিক্ষক তাদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং অতর্কিতে হামলা চালান।

অপর আহত সাংবাদিক তারিক জানান, পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে তারা যখন শিক্ষার্থীদের বই দেখে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেন এবং এ বিষয়ে জানতে চান, তখনই শিক্ষকরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ হামলায় তারা গুরুতর আহত হন। এসময় হামলাকারীরা তাদের দুটি মোবাইল ফোন এবং নাগরিক টেলিভিশনের বুম মাইক্রোফোনসহ পেশাগত সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, তাদের একটি কক্ষে আটকে রেখে দীর্ঘক্ষণ বন্দি করে রাখা হয়। পরবর্তীতে কৌশলে সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে তারা দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছুটে যান।

আহত রাব্বি ও তারিককে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য গাংনী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সুস্থ হয়ে তারা আইনি পদক্ষেপ নিতে গাংনী থানায় উপস্থিত হন। তবে অভিযোগ উঠেছে, থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে অভিযুক্ত শিক্ষকদের পক্ষ নিয়ে কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে সাংবাদিকদের দৃঢ় অবস্থানের মুখে শেষ পর্যন্ত তারা পিছু হটতে বাধ্য হন।

এ বিষয়ে গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুহাদ্দিদ মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, তাদের আটকে রাখা এবং মোবাইল ও পেশাগত সরঞ্জাম ছিনতাইয়ের ঘটনায় যারা জড়িত থাকবে, তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে, দুই সাংবাদিকের ওপর এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় জেলার সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও പ്രതിഷേധের সৃষ্টি হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। গাংনী প্রেসক্লাবের সভাপতি তৌহিদ উদ দৌলা রেজা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই টাকার বিনিময়ে নকলের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আমাদের দুই সহকর্মী যখন এই দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করতে যান, তখন অভিযুক্ত শিক্ষকদের উপস্থিতিতেই শিক্ষার্থীরা তাদের ওপর হামলা চালায় এবং সরঞ্জাম ছিনতাই করে। এটি অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

অন্যদিকে, হামলার অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক মনিরুজ্জামান বিপ্লবসহ সংশ্লিষ্ট অন্য শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।