জুলাই মাসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণে এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। এই মাসেই জেলার প্রবাসীরা মোট ৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় প্রাপ্তি। সাম্প্রতিক সময়ে এই জেলার বাসিন্দাদের মধ্যে বিদেশযাত্রার প্রবণতা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এই প্রবণতারই প্রভাব পড়েছে জেলা পর্যায়ের পাসপোর্ট অফিসে। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি অত্যন্ত ব্যস্ত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, বিদেশে যাওয়ার জন্য যে পাসপোর্টটি অত্যাবশ্যকীয় নথি, সেটি সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পাসপোর্ট অফিসের ভেতরেই গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও প্রভাবশালী দালালচক্র, যাদের সংক্ষেপে ‘চ্যানেল’ বলা হয়। অভিযোগ উঠেছে, এই পুরো ‘চ্যানেল’ কার্যক্রমের মূল নিয়ন্ত্রক হলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবির। পাসপোর্ট আবেদনকারীদের মাঝে তিনি এক বিশেষ নামে পরিচিত— ‘দরবেশ বাবা’। অভিযোগ রয়েছে, এই কথিত ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে আবেদন না করলে সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা এই চক্রের আশ্রয় নেন, তাদের সরকার নির্ধারিত ফি’র বাইরে কাজ ভেদে ৩ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এখন দীর্ঘদিনের এক ওপেন সিক্রেট। অফিসের ভেতরে এই ‘চ্যানেল’ দালালদের অবাধ বিচরণ চোখে পড়ার মতো। এমনকি বহিরাগত ব্যক্তিরা সরকারি অফিসের ভেতরে ঢুকে সরকারি কম্পিউটার ও সার্ভার ব্যবহার করে কাজ করছেন—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য এনপিবি নিউজের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই দুর্নীতির বলয় গড়ে উঠেছে বর্তমান উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে। তবে তিনি একা নন; এই অসাধু কার্যক্রমে তাকে সহযোগিতা করছেন উপসহকারী পরিচালক মোর্শেদুল হক এবং সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন।

এই চক্রের প্রভাব এতটাই প্রবল যে, ভুক্তভোগী আবেদনকারী থেকে শুরু করে অফিসের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ভয়ে মুখ খোলেন না। অভিযোগ রয়েছে, যারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার চেষ্টা করেন, তাদের উপপরিচালক শাহজাহান কবিরের প্রশ্রয়ে চরম হেনস্থা করা হয়। সরেজমিনে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, জেলার দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য মানুষের ভিড়। আবেদনকারীদের অনেকেই সরাসরি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে চান। কিন্তু ‘চ্যানেল’ না ধরে আসায় তাদের ফাইলে নানা ধরনের ভুল-ত্রুটির কথা বলে ফেরত দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, একই কাগজপত্র যখন ‘চ্যানেল’-এর মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়, তখন সব সমস্যা মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যায়। এই তথাকথিত ‘দ্রুত সমাধান’ পেতে ফাইলভেদে সর্বনিম্ন ৩ হাজার টাকা দিতে হয়, যার সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই। আবেদনের জরুরি অবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই টাকার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে নেওয়া হয়।

এনপিবি নিউজের অনুসন্ধানে আরও গুরুতর একটি বিষয় সামনে এসেছে। অফিসের অভ্যন্তরে জহির নামে এক বহিরাগত ব্যক্তিকে কম্পিউটারে বসে পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজ করতে দেখা যায়। দোতলার একটি কক্ষে কয়েকজন দালালকে ওই ব্যক্তির কাছে আবেদনকারীদের কাগজপত্র নিয়ে আসতে দেখা গেছে। তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি কৌশলে একটি আবেদনপত্র দিয়ে মুখ আড়াল করেন এবং দ্রুত সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে তাকে সহকারী হিসাবরক্ষক মো. জয়নাল আবেদীনের কক্ষের দিকে যেতে দেখা যায়। এমনকি অফিসের গেটে থাকা আনসার সদস্যের কাছেও একটি আবেদনপত্র দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হলে তিনি পুনরায় জয়নাল আবেদীনের কাছে যান। তবে ক্যামেরার সামনে জয়নাল আবেদীন ওই ব্যক্তিকে চেনেন না বলে দাবি করেন।

এরপর যখন ওই ব্যক্তিকে উপপরিচালক মো. শাহজাহান কবিরের কাছে নেওয়া হয়, তখন তাকে আইনি শাস্তির আওতায় আনার পরিবর্তে উপপরিচালক তাকে অফিসের একজন ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ওই বহিরাগত ব্যক্তির পক্ষ নিয়ে কথা বলেন শাহজাহান কবির। পরবর্তীতে এনপিবি নিউজের কাছে ওই ব্যক্তি স্বীকার করেন যে, তিনি একসময় আনসার সদস্য ছিলেন এবং এখন পাসপোর্ট অফিসে এসে বিভিন্ন কাজ করে দেন। তবে কার অনুমতিতে তিনি সরকারি কম্পিউটারে কাজ করছেন, সে বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি। তবে এটি স্পষ্ট যে, তার সঙ্গে ‘চ্যানেল’ চক্রের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। সরকারি অফিসের অনুমোদিত জনবলের বাইরে কোনো ব্যক্তি সরকারি সার্ভারে কাজ করতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যান উপপরিচালক শাহজাহান কবির এবং ওই ব্যক্তির পক্ষে যুক্তি দেখাতে থাকেন।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, অফিসের বিভিন্ন কক্ষে কিছু মানুষ কোনো বাধা ছাড়াই যাতায়াত করছেন। অফিসেরই কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এরা সবাই দালালচক্রের সদস্য এবং শাহজাহান কবির তাদের অবাধ চলাফেরারের সুযোগ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নৈশপ্রহরীদেরও তাদের নির্ধারিত কাজের বাইরে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা গেছে, যা সরকারি অফিসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।

আর্থিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুর্নীতির পরিমাণ আকাশচুম্বী। প্রতিদিন গড়ে ৩০০টির বেশি আবেদন জমা পড়ে এই অফিসে, যার বড় একটি অংশ আসে ‘চ্যানেল’ দালালদের মাধ্যমে। প্রতি আবেদনে গড়ে ৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত আদায়ের হিসেবে, এই চক্রটি দৈনিক প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা অবৈধভাবে আত্মসাৎ করছে। একজন কর্মকর্তার দাবি অনুযায়ী, প্রতি বুধবার বিকেলে এই সংগৃহীত টাকার ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়। আদায়কৃত টাকার সিংহভাগ যায় উপপরিচালক শাহজাহান কবিরের পকেটে এবং বাকি অংশ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। দালালচক্রের একজন সদস্য এনপিবি নিউজকে নিশ্চিত করেছেন যে, মোট আদায়কৃত টাকার ৫০ শতাংশ সরাসরি উপপরিচালকের ড্রয়ারে জমা হয় এবং পদমর্যাদা অনুযায়ী বাকি টাকা অন্যদের মধ্যে ভাগ করা হয়।

এই সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে যখন এনপিবি নিউজ টিম উপপরিচালক শাহজাহান কবিরের মুখোমুখি হয়, তিনি কোনো অভিযোগেরই সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সভাপতি কবি আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, “এই জেলাটিকে সবসময় নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং করা হয়, অথচ কেউ পজিটিভ কোনো ব্যবস্থা নেন না। পাসপোর্ট অফিসের এই ভোগান্তি দীর্ঘদিনের। মনে হয় সব স্তরের কর্মকর্তারা এতে জড়িত, নইলে এত অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয় না কেন?”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পাসপোর্ট অফিসের প্রায় প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আলাদা আলাদা অভিযোগ রয়েছে। এর আগে তদন্ত ও অভিযান চালানো হলেও তা সাময়িক ফল দেয়; কয়েকদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তিনি আরও জানান, ব্যবস্থা নিতে চাইলে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল এবং রাজনৈতিক চাপ আসে, যার ফলে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, পাসপোর্ট অফিস তার আওতাধীন নয়। তবে জেলার নাগরিকরা সমস্যার সম্মুখীন হলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন। তিনি জনগণকে অভিযোগ সেলে তাদের সমস্যার কথা জানাতে আহ্বান জানান এবং বলেন যে, আগেও অনেক অভিযোগ শুনেছেন এবং এর প্রতিকারের চেষ্টা করবেন। তবে এই পুরো ঘটনায় পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. নূরুল আনোয়ার এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) এটিএম আবু আসাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে এনপিবি নিউজ। ফোনে কল এবং হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের কোনো উত্তর না পাওয়ায় তাদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।