নিজের মৃত্যুর পর দাফন-কাফনের জন্য টাকার অভাব হবে এবং তাকে অন্যের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে—এই প্রবল আশঙ্কায় সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ সারা জীবন ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে রাখতেন। শুনতে অবাক মনে হলেও মনপুরার ভোলায় ঘটেছে এমনই এক হৃদয়স্পর্শী ও বিরল ঘটনা। এই ঘটনায় আলোচনায় আসা ওই বৃদ্ধের প্রকৃত নাম ওয়াহাব পাটোয়ারী, তবে স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘মপুর বাপ’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের আন্দিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওয়াহাব পাটোয়ারী মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন ছিলেন। তবে তার চিন্তা ছিল অত্যন্ত গভীর। মৃত্যুর পর নিজের জানাজা, দাফন এবং কুলখানির জন্য যেন কোনো অর্থের সংকট না হয়, সেই লক্ষ্যেই তিনি ভিক্ষা করে পাওয়া সামান্য অর্থ সঞ্চয় করতেন। এই টাকাগুলো তিনি নিরাপদ রাখার জন্য সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন হাওলাদারের কাছে আমানত হিসেবে জমা রাখতেন। সারাদিন বাজারে বাজারে ঘুরে ভিক্ষা করে তিনি যা পেতেন, তা পলিথিনে মোড়ানো ছোট পুঁটলিতে করে সংগ্রহ করতেন এবং পর্যায়ক্রমে তা চেয়ারম্যানের কাছে জমা দিতেন। পথে-ঘাটে ঘুমানো এবং একাকী জীবন কাটানো এই বৃদ্ধের কাছে তার জমানো অর্থই ছিল শেষ সময়ের একমাত্র অবলম্বন।
গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে উপজেলার কলাতলী ইউনিয়নে কবির বাজারে মেয়ের বাড়িতে থাকাকালীন এই বৃদ্ধ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর সাবেক চেয়ারম্যানের কাছে আমানত রাখা সেই পুঁটলিটি গণনা করা হলে দেখা যায়, সেখানে মোট ৮ হাজার ৯৮৫ টাকা জমা ছিল। তার শেষ ইচ্ছা ও অছিয়ত অনুযায়ী, সেই জমানো টাকা দিয়েই দাফনের কাপড় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা হয়। শুক্রবার জুম্মার নামাজের আগে কলাতলী ইউনিয়নের মনির বাজার জামে মসজিদে জানাজা শেষে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে তাকে দাফন করা হয়।
এই ঘটনায় স্থানীয়দের মনে গভীর শোক ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন হাওলাদার এবং উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি রাজিব চৌধুরী জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। একজন মানুষ তার মৃত্যুর পর যেন কারও বোঝা না হয়ে যান, সেই চিন্তা থেকে তিনি নিজেই নিজের দাফনের টাকা জমিয়ে রেখেছিলেন। তারা আরও জানান, ওয়াহাব পাটোয়ারীর অছিয়ত অনুযায়ী তার বাকি সব কাজ সম্পন্ন করা হবে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু অর্থ প্রদান করেছেন এবং সবাই মিলে একটি কুলখানির আয়োজন করে মানুষকে খাওয়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। নিঃস্ব এক মানুষের আত্মনির্ভরতার এই করুণ কাহিনী এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।















