২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বসেরা অভিনেত্রী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ভোলার লালমোহন উপজেলা নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন। বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আয়োজিত এই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শাসনকাল ও গুমের ঘটনা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
স্পিকার বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের গণভবনে ডেকে তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার আড়ালে গুমের ঘটনায় তার প্রত্যক্ষ ও গভীর সম্পৃক্ততা ছিল।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শেখ হাসিনা গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারকে আশ্বস্ত করতেন এবং তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেন, অথচ প্রকৃতপক্ষে তার ভেতরেই এই নির্মম কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার এক হিংস্র মানসিকতা লুকিয়ে ছিল। স্পিকারের মতে, শেখ হাসিনা জানতেন গুম হওয়া ব্যক্তিরা কোথায় রয়েছেন, কিন্তু জনসম্মুখে তিনি এমন অভিনয় করতেন যেন তিনি নিজেও এই ঘটনায় চরম উদ্বিগ্ন। জনগণ তখন এই ধূর্ততা বুঝতে পারেনি, তবে এখন সব সত্য উন্মোচিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমের ঘটনায় সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের প্রসঙ্গ টেনে স্পিকার বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের দেওয়া সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এখন মানুষের কাছে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনা কেবল একজন অভিনেত্রীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন গুমের মূল নির্দেশদাতা।’ স্পিকার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, একজন ব্যারবারকে আট বছর ধরে হাতকড়া পরিয়ে আয়না ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। শেখ হাসিনার পতন এবং দেশ ছাড়ার পর সেই ব্যক্তি মুক্ত হয়েছেন এবং বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিগত সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ তুলে মেজর (অব.) হাফিজ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে দুর্নীতির চরম উদাহরণ পাওয়া যায়। সেখানে একটি সাধারণ বালিশের দাম ধরা হয়েছিল ৬০ হাজার টাকা এবং একটি পর্দার দাম ৪২ হাজার টাকা। এছাড়া তৎকালীন একজন ভূমি প্রতিমন্ত্রীর লন্ডনে ৩৬০টি বাড়ি থাকার অভিযোগও তিনি সামনে আনেন। তিনি দাবি করেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
লালমোহনের স্থানীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্পিকার বলেন, বিগত সরকারের আমলে এখানকার স্থানীয় সংসদ সদস্য ছিলেন একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও খুনি। ২০১০ সালের উপনির্বাচনের সময় ঢাকা থেকে আসা সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় এবং বাড়িঘর ভাঙচুর করে। তিনি তার নির্বাচনী প্রধান সমন্বয়ক ও ভোলা-৪ আসনের সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আলমকে হামলার শিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করেন।
সভার শেষ পর্যায়ে স্পিকার তার দায়িত্ব পালনে জনগণের সন্তুষ্টি যাচাইয়ের জন্য একটি অনন্য উদ্যোগ নেন। সংসদীয় পদ্ধতির আদলে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হিসেবে তার কাজে সন্তুষ্ট কি না, তা জানতে ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের আহ্বান জানান। উপস্থিত জনতা সর্বসম্মতিক্রমে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে এবং করতালির মাধ্যমে তার কাজের সমর্থন জানালে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাফর ইকবাল এবং সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বাবুল। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী।


















