‘আমি লড়াকু কিন্তু পরাজিত’—গত ১৮ আগস্ট ফেসবুকে লেখা এই একটি বাক্য এখন হয়ে উঠেছে এক করুণ আর্তনাদ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক আবু বকর সিদ্দিকীর এই আক্ষেপ তখন হয়তো কেউ বুঝতে পারেননি, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এই কথাগুলো কতটা বাস্তব এবং বেদনাদায়ক হয়ে উঠবে। গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সেনা প্রশিক্ষণ এলাকায় ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় এক ভয়াবহ ট্যাংক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। তার এই আকস্মিক প্রস্থান এখন কাঁদছে তার সহকর্মী, বন্ধু এবং শোকাতুর স্বজনদের।

আবু বকর সিদ্দিকীর ফেসবুক আইডি ‘A B C Piyas’। তার ডিজিটাল স্মৃতিগুলো ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি কেবল একজন সৈনিক ছিলেন না, ছিলেন একজন সংবেদনশীল মানুষ। ফেসবুকে তিনি প্রায়ই অনুপ্রেরণামূলক নানা লেখা শেয়ার করতেন। কখনো নিজের কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করে প্রকাশ করতেন তার মনের কথা। তার প্রতিটি পোস্টে ফুটে উঠত জীবনের কঠিন সংগ্রাম, মাঝেমধ্যে হতাশা, আর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর তীব্র প্রত্যয়। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটি পোস্ট সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে—‘আমি লড়াকু কিন্তু পরাজিত।’ দুর্ঘটনার পর তার সহকর্মী ও পরিচিতরা এই পোস্টটি শেয়ার করছেন এবং মনে করছেন, হয়তো তিনি জানতেন তার সময় ফুরিয়ে আসছে।

প্রিয় মানুষের চলে যাওয়ার পর তার শেষ কথাগুলো এখন সহযোদ্ধাদের কাছে এক নতুন ও করুণ অর্থ নিয়ে ফিরে এসেছে। আবু বকর সিদ্দিকীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোদ্ধা মো. সালাউদ্দিন ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমার খুব প্রিয় কাছের বন্ধু সহযোদ্ধা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক A B C Piyas আমাদের মাঝে আর নেই।’ এই আকস্মিক বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারছেন না তার সহকর্মীরা। সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একসঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, কঠোর প্রশিক্ষণ এবং নানা অভিজ্ঞতার স্মৃতি এখন তাদের চোখে জল আনছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও যিনি তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছিলেন, প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলেন, সেই মানুষটিই আর ফিরবেন না—এই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। সালাউদ্দিন তার পোস্টে বন্ধুর আত্মার শান্তির জন্য দোয়া চেয়ে লিখেছেন, ‘আল্লাহ যেন বন্ধুকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।’

আবু বকরের প্রয়াণে সবচেয়ে বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে তার পরিবারে। নোয়াখালীর কবিরহাটের সুন্দরপুর এলাকার মুন্সিরসদর বাড়িতে এখন শুধুই শোকের মাতম। তার রেখে যাওয়া এক বছরের ছোট্ট মেয়ে ফাতেহা সিদ্দিক এখন আর বাবার স্নেহ-ছায়ায় বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে না। বাবার মুখ, কণ্ঠস্বর কিংবা তার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে রাখার মতো বয়সও হয়নি শিশুটির। জীবনের শুরুতেই সে হারাল তার সবচেয়ে বড় আশ্রয়কে। হাটহাজারীর প্রশিক্ষণ এলাকায় যখন দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে, তখন নোয়াখালীর সেই বাড়িতেও নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্যদের কাছে আবু বকর শুধু একজন সেনাসদস্য ছিলেন না, ছিলেন আদর্শ স্বামী, স্নেহময় বাবা এবং পরিবারের প্রাণ। তার মৃত্যুর খবরটি যখন পরিবারের কাছে পৌঁছায়, সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। হঠাৎ করে একজন কর্মক্ষম তরুণের এমন অকাল মৃত্যু পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

আবু বকরের ফেসবুক পাতায় তার ব্যক্তিগত জীবন এবং চিন্তার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায়। তিনি কখনো জীবন নিয়ে গভীর ভাবনা প্রকাশ করতেন, কখনো নিজের ভেতরের লড়াইয়ের কথা বলতেন। তবে ১৮ আগস্টের সেই ছোট্ট বাক্যটি—‘আমি লড়াকু কিন্তু পরাজিত’—এখন তার পরিচিত মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন লড়াকু সৈনিকের এই পরাজয় আসলে মৃত্যুর কাছে পরাজয়, যা তার প্রিয়জনদের মনে আজীবন এক গভীর ক্ষত রেখে যাবে।