হাফিজুর রহমান খান

বায়োইনফরমেটিক্স ও ডেটা অ্যানালাইসিসভিত্তিক গবেষণাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালের শেষ দিকে কয়েকজন তরুণ গবেষককে সঙ্গে নিয়ে ‘বায়োল্যাব’ নামে গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও কক্সবাজারের কৃতি সন্তান নাইমুল হাসান সিদ্দিকী। প্রায় চার বছরের পথচলায় গবেষণা প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ, গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

বায়োল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির তত্ত্বাবধানে ২৮টি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি কিউ-ওয়ান (Q1), ১৪টি কিউ-টু (Q2) এবং তিনটি কিউ-থ্রি (Q3) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। আরও ২২টি গবেষণাপত্র বর্তমানে সাবমিশন প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং ১৪টি গবেষণাপত্রের কাজ চলমান।

নাইমুল হাসান সিদ্দিকীর দাবি, বর্তমানে ৪৪টি গবেষণাপত্রে তাঁর নাম লেখক হিসেবে রয়েছে। পাশাপাশি নোবিপ্রবিসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮২ জন শিক্ষক-শিক্ষার্থী বায়োল্যাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন।

গবেষণাকে হাতের নাগালে আনাই লক্ষ্য:

বায়োইনফরমেটিক্সের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কম্পিউটারভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জেনেটিক্সসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় পরিসরে তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এই গবেষণাকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজলভ্য করে তুলতে কাজ করছে বায়োল্যাব।

নাইমুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, অনেকের ধারণা গবেষণা করতে হলে ব্যয়বহুল ল্যাবরেটরি ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু বায়োইনফরমেটিক্সের ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন ডেটাবেজে বিপুল পরিমাণ গবেষণাতথ্য উন্মুক্ত রয়েছে। সেগুলো বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারলেই অনেক গবেষণা করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে একটি কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার দিয়েই গবেষণার বড় একটি অংশ পরিচালনা করা সম্ভব।

১৩টি কোর্স, সঙ্গে ইন্টার্নশিপ:

প্রতিষ্ঠার পর থেকে বায়োল্যাব ১৩টি গবেষণাভিত্তিক কোর্স পরিচালনা করেছে। এসব কোর্সে শিক্ষার্থী, গবেষক ও শিক্ষকদের বায়োইনফরমেটিক্সভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি গবেষণার বিভিন্ন বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ড্রাগ ডিজাইন ও মলিকুলার ডিজাইনিং বিষয়ে ছয় মাস মেয়াদি দুটি ইন্টার্নশিপও নিয়মিত পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

গবেষণা থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথ:

গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করাও বায়োল্যাবের অন্যতম কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা নাইমুল হাসান সিদ্দিকীর দাবি, গত তিন বছরে বায়োল্যাবের মাধ্যমে গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করে ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বিভিন্ন দেশের স্কলারশিপ অর্জন করেছেন।

শুধু ২০২৬ সালেই ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ১৩ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন মর্যাদাপূর্ণ ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপ লাভ করেছেন বলে জানিয়েছে বায়োল্যাব।

চলছে ৩৬টি গবেষণা প্রকল্প:

বর্তমানে বায়োল্যাবের অধীনে ৩৬টি গবেষণা প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব গবেষণা কার্যক্রমে নাইমুল হাসান সিদ্দিকীর পাশাপাশি নোবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমানে নটরডেম ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রভাষক আহমেদ আব্দুল্লাহ মাহাদীন কো-সুপারভাইজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রামসহ (আইআইইউসি) দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকেরা বায়োল্যাবের বিভিন্ন কোর্সে প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।

আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ:

বায়োল্যাবের কার্যক্রম শুধু গবেষণা ও প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শিক্ষার্থী বর্তমানে রিসার্চ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। সম্মানীর মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ব্যয় বহন করছেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ ফি মওকুফ, আংশিক ফি ছাড় এবং কিস্তিতে ফি পরিশোধের সুযোগ। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো শিক্ষার্থী যাতে গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থেকে পিছিয়ে না পড়েন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা।

নিজ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে নাইমুলের আক্ষেপ:

নোবিপ্রবির প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে নাইমুল হাসান সিদ্দিকীর। তাঁর ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান গবেষণা ও প্রশিক্ষণের জন্য বায়োল্যাবের সঙ্গে কাজ করলেও নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়নি।

নাইমুল হাসান সিদ্দিকী বলেন, নোবিপ্রবিতে গবেষণা মেলা কিংবা গবেষণাবিষয়ক বিভিন্ন আয়োজন হলেও বায়োল্যাবের সঙ্গে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়নি। সুযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আরও বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব হতো।

তবে এ আক্ষেপের চেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর প্রত্যাশাই বেশি। তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করার মাধ্যমে তাঁরা মূলত নোবিপ্রবিকেই প্রতিনিধিত্ব করছেন। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও বড় পরিসরে গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলতে চান তাঁরা।

ঢাকায় আধুনিক ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা:

বর্তমানে নোয়াখালী থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ঢাকায় একটি শাখা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে বায়োল্যাব। সেখানে ইন-ভিট্রো ও ইন-ভিভো গবেষণার জন্য একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান নাইমুল হাসান সিদ্দিকী।

তাঁর মতে, গবেষণাকে শুধু ব্যয়বহুল ও জটিল একটি বিষয় হিসেবে দেখলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ গবেষণার বাইরে থেকে যাবে। তাই সহজলভ্য প্রযুক্তি ও উন্মুক্ত গবেষণাতথ্য কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীদের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য।

কক্সবাজারের সন্তান নাইমুল হাসান সিদ্দিকীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা বায়োল্যাব ইতোমধ্যে বায়োইনফরমেটিক্স প্রশিক্ষণ, গবেষণা প্রকাশনা ও উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতে ঢাকায় আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজের মাধ্যমে গবেষণার পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।